শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চাই মূল্যবোধভিত্তিক নির্মল সমাজ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৬:৫৭

গ্রাম কিংবা শহর সকালের পরিবেশটা স্বভাবতই খুব নির্মল থাকে। থাকে বিশুদ্ধ বাতাস, যানবাহন-মানুষের কোলাহলমুক্ত প্রহর। যেটুকু কোলাহল, তার সবটুকুই প্রকৃতির। নানা রকম পাখির ডাক আর বাতাসের স্নিগ্ধ ছোঁয়া। এ সময়টাতে মন থাকে শান্ত ও কোমল। ইচ্ছে করে প্রকৃতির সবটুকু শান্ত, নির্মল প্রাণশক্তিকে প্রশ্বাসের মাধ্যমে নিজের অন্তঃকরণে ঢুকিয়ে নিতে। বড্ড ইচ্ছে হয় শুদ্ধতায় অবগাহন করতে।

বস্ত্তত নির্মল সমাজ বিনির্মাণে চাই শুদ্ধ মানুষ, বিশুদ্ধ সমাজ। প্রকৃত শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, চিকিত্সক, দার্শনিক, রাজনীতিক, সমাজকর্মী, সাংবাদিক—এমন সব নানা মাত্রিক ভূমিকায় শুদ্ধ মানুষ সৃষ্টি হয়। যদিও ইতিহাস বলে, তাদের সৃষ্টি ও সৃজনের পথ-পরিবেশ বেশ বন্ধুর, প্রতিকূল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাষায়, ‘যাহাদের অভিপ্রায় সত্ ও প্রশংসনীয় এরূপ লোক বিরল এবং শুভ ও শ্রেয়স্কর বিষয়ে বাধা ও ব্যাঘাত জন্মাইবার লোক সহস্র সহস্র।’ তাই শুদ্ধ মানুষদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদেরকে উজাড় করে আলোকিত সমাজ ও মানুষ গঠনের কাজ করতে পারবেন।

সংস্কৃতি মানুষের মানবিক সত্তা গঠনের অনুষঙ্গ। যে কোনো দেশের সামাজিক সংস্কৃতি সে দেশের জাতিসত্তাকে বিশ্লেষণ করে। প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ ও কল্যাণকে ধারণ করা সংস্কৃতির শুদ্ধচর্চায় মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে; মানবোচিত হই আমরা। সতত শুদ্ধ বাঙালিয়ানার মধ্যেই নিহিত সতত শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি। নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালির যে মাঙ্গলিক তথা মানবিক চরিত্র তা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই সাংস্কৃতিক অক্ষুণ্নতা। অপসংস্কৃতি বা উপসংস্কৃতি যা-ই বলি না কেন, তার অবাধ অনুপ্রবেশ রোধ করা প্রয়োজন। এই অনুপ্রবেশ বাঙালির আবহমান সংস্কৃতিকে দূষিত করছে। ফলে আমাদের সাম্প্রতিক সমাজচিত্রে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা। কিশোর অপরাধ, নারী নির্যাতন-নিপীড়ন, নৈতিকতার অবক্ষয়, বেপরোয়া জীবনযাপন, পারিবারিক ভাঙনের মতো বহু ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি আমরা প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি মানুষের মানবিক গুণগুলোও আবেদন হারাচ্ছে দিনদিন। মানুষ হয়ে উঠছে সহিংস। তুচ্ছ ঘটনা পাশবিক পরিণতির রূপ পরিগ্রহ করছে। এসব অসংগতি রোধকল্পে নতুন প্রজন্মকে বাঙালিত্বের রূপ-রস-গন্ধের সঙ্গে পরিচিত করানো অতি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের সমাজে।

বাঙালি সংস্কৃতিচর্চাকে সর্বজনীন ব্যাপ্তি দান করতে পারলে তবেই সমাজের মানবিকসত্তা পুনর্জাগ্রত হবে; যার মধ্য দিয়ে প্রস্ফুটিত হবে বাঙালির পরমতসহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও নিরাপদবোধ। মানুষে মানুষে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও বিত্তকেন্দ্রিক সংঘাত এবং অন্যান্য নানা সংকট পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেবে সম্প্রীতি ও সাম্যে। সমাজ হবে শান্ত-সৌম্য-স্হিতিশীল। সর্বমঙ্গলের আধার হয়ে উঠবে সমাজ। সর্বক্ষেত্রেই আমাদের বুঝতে হবে, আধুনিকতাকে বরণ করার জন্য নিজস্ব ঐতিহ্যকে হরণ করা আবশ্যক নয় কোনোভাবেই। বরঞ্চ নিজের ঐতিহ্যকে প্রাগ্রসর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই আধুনিকতা এবং সার্থতকতাও এখানেই।

ভারতের বিখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বিশ্বাস করেন, ‘তিন জনই পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তারা হলেন বাবা, মা ও শিক্ষক।’ দেশ বা জাতির সবচেয়ে মৌলিক স্তর হচ্ছে সমাজ। সেখানে শিক্ষকদের দায়িত্বকে যদি খুব সরল দৃষ্টিতে বিভাজন করা হয়, তাহলে বলতে হয়—এক. শিক্ষিত করা, দুই. মানুষ বানানো। এক্ষেত্রে তার পরোক্ষ দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষিত করা এবং প্রত্যক্ষ দায়িত্ব মানুষ বানানো। শিক্ষকদের দায়িত্ব সম্পর্কে এ পি জে আবদুল কালামের পরামর্শ হচ্ছে, ‘শিক্ষাবিদদের উচিত শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুসন্ধানী, সৃষ্টিশীল, উদ্যোগী ও নৈতিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে তারা আদর্শ মডেল হতে পারে।’ শিক্ষকদেরকে এই নীতিকর্তব্য পালন করতে হবে। শিক্ষক যার ভেতরে প্রকৃতশিক্ষার বীজ রোপণ করতে সক্ষম হবেন, সে-ই প্রকৃত মানুষ হবে।

বর্তমান সময়ের একটি বড় সংকট হচ্ছে গুজব, যেটির সৃষ্টি ও চর্চা সামাজিক মাধ্যমেও হয়; আবার হাটে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরেও হয়। তবে সমাজবিনাশী সেসব গুজব সুশিক্ষিত বা আলোকিত মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাই তো মাঝেমধ্যে অন্ধবিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাস করার প্রবণতা মঙ্গল বয়ে আনে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘অবস্হা ও ব্যবস্হা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন—‘অবিশ্বাস করিবার একটা শক্তি মানুষের পক্ষে অবশ্যপ্রয়োজনীয়। ইহা কেবল একটা নেতিভাবক গুণ নহে, ইহা কর্তৃভাবক। মনুষ্যত্বকে রক্ষা করিতে হইলে এই অবিশ্বাসের ক্ষমতাকে নিজের শক্তির দ্বারা খাড়া করিয়া রাখিতে হয়। যিনি বিজ্ঞানচর্চায় প্রবৃত্ত তাঁহাকে অনেক জনশ্রুতি, অনেক প্রমাণহীন প্রচলিত ধারণাকে অবিশ্বাসের জোরে খেদাইয়া রাখিতে হয়, নহিলে তাঁহার বিজ্ঞান পণ্ড হইয়া যায়। যিনি কর্ম করিতে চান অবিশ্বাসের নিড়ানির দ্বারা তাঁহাকে কর্মক্ষেত্র নিষ্কণ্টক রাখিতে হয়। এই-যে অবিশ্বাস ইহা অন্যের উপরে অবজ্ঞা বা ঈর্ষাবশত নহে; নিজের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি, নিজের কর্তব্যসাধনার প্রতি সম্মানবশত।’ কাজেই সমাজে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি একান্ত কাম্য, যাদের আলোকিত কর্মের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে এক নির্মল মানবিক সমাজ। আমাদের কাছে তারা হবেন চিরস্মরণীয়, চিরবরণীয়। তারা হবেন ঠিক লুই আরাগেঁর কবিতার মতো—‘আমাদের দুর্গত জগতের তারাই সেরা মানুষ/ নাম না বললেও তোমরা চিনবে/ দিঘল সন্ধ্যার অগ্নিশিখাগুলিকে বুঝবে।’

বলতেই হয়, আজকের সমাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হচ্ছে দেশাত্মবোধ ও সততা। সমাজের প্রতিটি ভালো কাজের অংশীজন হওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি হতে হবে সবার মধ্যে। সমাজের সম্ভাবনাগুলোকে যেমন এগিয়ে নিতে হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, তেমনি সংকটগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে সামষ্টিক অংশগ্রহণে। সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ব্যক্তি-মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিটা হতে হবে খুব শক্তিশালী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া বক্তৃতায় দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা আমলাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনি চাকুরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক, আপনার সংসার চলে ওই টাকায়, আমি গাড়ি চড়ি ওই টাকায়,...ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন, ওরাই মালিক...।’

বঙ্গবন্ধুর সমতা-সহমর্মিতার বাণী প্রতিধ্বনি হোক সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নির্মল প্রভাতবেলার মতো সমাজটা গড়ে উঠুক সম্মিলিত সুকুমার প্রয়াসে। সেখানে থাকুক শুধু দেশাত্মবোধ ও মাঙ্গলিক কোলাহল।

লেখক: কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন