রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিণাম সম্পর্কে সচেতন থাকাই উত্তম

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩৯

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তৈলের মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে সংগতি রাখিতে গিয়া বাংলাদেশেও তৈলের মূল্য সমন্বয় করা হইয়াছে। বিশ্বব্যাপী এই মূল্যবৃদ্ধির পরিণাম কাহারো অজানা নহে। ইহার ফলে কলকারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাইবে, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাইবে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাইবে; অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রেই দেখা দিতে পারে অস্থিরতা। শ্রমিক রাস্তায় নামিয়া আসিবে, মালিক বলিবে আমরা আর চালাইতে পারিতেছি না। 

তথাপি অন্য দিক দিয়া বিবেচনা করিলে বলিতে হয়, এই সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে অন্য কোনো উপায়ও খোলা নাই। কেননা, নিজের অর্থে যদি সরকার চলে, তাহাকে কাহারো নিকট কৈফিয়ত না দিলেও চলে; কিন্তু যাহাদের ধার করিয়া চলিতে হয় তাহাদের যৌক্তিক বা অযৌক্তিক নানা সুপারিশ, নানা নির্দেশনা মানিয়া চলিতে হয়। করোনা ভাইরাস যখন দেখা দিল, তখন দুই বৎসর টিকিয়া থাকিতে জিহ্বা বাহির হইয়া যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হইল; কিন্তু বিশ্ব যখন ডুবিয়া যাইবার মতো পরিস্থিতিতে, তখনো অনেকে বলিয়াছেন, আমরা ভাসিয়া আছি; কিন্তু ভাসিয়া কতটা থাকা গিয়াছে তাহা একটি প্রশ্ন।

বাস্তবতা হইল, ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের শর্ত মানিয়া না লওয়া প্রায় অসম্ভব। গণতান্ত্রিক বা উন্নয়নশীল বিশ্বের আবার ঐ শর্তগুলি মানাও কঠিন হইয়া পড়ে। ইহা নূতন কোনো বাস্তবতা নহে। ৩০ বা ৪০ বৎসর পূর্বেও চিত্রটি এই রূপই ছিল। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হইবার পর চক্ষু খুলিয়া বিশ্বের নামিদামি প্রচারমাধ্যমে এক অস্থিরতার চিত্র প্রকাশ পাইতেছে। এখন আবার তাইওয়ান লইয়া যাহা ঘটিতেছে তাহাতে সকল কিছু যেন স্থবির হইয়া যাইবার আশঙ্কা জাগিয়া উঠিয়াছে। এই সকল ঘটনার প্রভাবে আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে যাহা ঘটিবে, তাহা সকল দেশই উপলব্ধি করিতে পারিবে। সুতরাং বহুজাতিক কোম্পানি অথবা বড় বড় অর্থনীতিবিদ যাহাই বলুন না কেন, যাহারা বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশ পরিচালনা করিতেছেন তাহারাই কেবল বুঝিতেছেন গরম পাথরের উপর পা রাখিলে তাহা কতটা পুড়িতেছে বলা যত সহজ, কোনো কিছু করা তত সহজ নহে। সুতরাং যাহারা বিভিন্ন দেশ পরিচালনা করিতেছেন তাহাদের প্রথম হইতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। শুধু ভাসিয়া থাকিবার স্বপ্নে থাকিলে চলিবে না। কেহ কোনো কথা বলিলে বা সকল কিছুর মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাইলে চলিবে না। গণমাধ্যম বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের হয়তো দাবাইয়া রাখা যায়; কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকাইতে হইবে। কারণ বাস্তবে যাহা ঘটিবার তাহা ঘটিবেই। এখন অর্থনীতিতে যাহা ঘটিতেছে তাহা বহুকালের পুঞ্জীভূত অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতির, পাপের ফসল। অর্থাৎ যাহারা এই সকল বিষয়ে দৃষ্টি রাখেন না, তাহাদের নিকট প্রশ্ন থাকিতে পারে, ক্ষমতায় আসেন কেন? অপচয় সকল সময়েই ছিল। সরকারি-বেসরকারি সকল খাতেই। বেসরকারি খাতে যে অপচয় ছিল তাহা শুধরাইবার দায়িত্ব ছিল কাহার? সরকারি খাতে দুর্নীতি, অপচয় এই সকল কাহাদের দ্বারা সংঘটিত হয়? আমরা বরাবরই দেখিতে পাই, দরিদ্র দেশে যে আর্থিক অসংগতি বিদ্যমান থাকে, তাহা সুরাহা করিবার কোনো সদিচ্ছা ক্ষমতাসীনদের থাকে না। তাহারা শুধু পূর্বের সরকারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া থাকেন। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এবং তাহা স্বভাবতই ঋণের টাকায়; কিন্তু দেখা যায়, সেই প্রকল্প বরাদ্দের বড় একটি অংশ হাওয়া হইয়া গিয়াছে। কারণ অস্পষ্ট নহে। চার্বাক দর্শনে বহুল উচ্চারিত উক্তি আছে, ‘ঋণং কত্বা, ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ’, অর্থাৎ ঋণ করিয়া হইলেও ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো; কিন্তু আধুনিক সময়ে আসিয়া ঋণ করিয়া খাইলেই সুখী হওয়া যায় না। কত কিছু মানিয়া লইতে হয় এবং পরিণতি ভোগ করিতে হয় তাহা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা আজ বড়ই প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আছে খরার আঘাতও

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

পবিত্র আশুরা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চেতনা

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা

অস্তকালে কে থাকিবে দিবাকরের সহিত?