রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সিলেটের গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলার দেড় যুগ

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ২০:৪৪

দীর্ঘ আঠারো বছর পূর্ণ হলেও সিলেট গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি এখনো। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামীম আহমদ বলেন, করোনাকালে আদালত বন্ধ থাকায় চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচার কার্যক্রমে  অগ্রগতি হয়নি। তাই সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণও বিলম্বিত হয়। 

২০০৪ সালের ৭ আগস্ট সিলেটের তালতলায় গুলশান সেন্টারে জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা চালায়। তখন আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহীম আলী মারা যান। তৎকালীন মেয়র কামরান ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও আহত হন ১৭ নেতা কর্মী। বর্বরোচিত এ হামলার ১৮ বছর পূর্ণ হয় গত রবিবার। 

সূত্র জানায় মামলাটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে- তারপরও  গতি আসেনি বিচার কার্যক্রমে। এদিকে গ্রেনেডের স্প্রিন্টার বয়ে বেড়ানো আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই বলেন,‘জানিনা এই বিচার কার্যক্রম কবে শেষ হবে।’ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট জুবায়ের বখত জুবের জানান, লকডাউনের পরে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে  সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসলেন। কিন্তু আসামীরা অনুপস্থিত থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি।  সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। 

সূত্র জানিয়েছে, সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। ৬৪ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০১৫ সালের ১৫ জুন এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ৭ মে ৮ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। 

৮ আসামির মধ্যে ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল মুফতি আব্দুল হান্নান, শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয় ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা মামলায়। অপর দুই আসামী মাওলানা তাজ উদ্দিন ও হুমায়ুন কবির হিমু ঘটনার পর থেকে পলাতক। বর্তমানে মামলার অপর ৩ আসামী মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা মো. মফিজুল ইসলাম ওরফে মফিজ ওরফে অভি ওরফে মহিব উল্ল্যাহ ও আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট কারাগারে আটক আছে। 

২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর সিলেটের জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ৫ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বিস্ফোরক মামলায় কারাগারে আটক ৩ আসামি ও পলাতক ২ আসামী সহ এই ৫ আসামী হত্যা মামলারও আসামি। সিআইডি‘র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রওনকুল হক চৌধুরী সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে চাঞ্চল্যকর এ মামলার পুনঃতদন্ত করেন। তদন্তে আলী এন্টারপ্রাইজের মালিক সিলেট জেলার বিশ্বনাথের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী বলে বেরিয়ে আসে। 
সিআইডি এ বিষয়ে ২০১১ সালে বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আগের অভিযোগপত্রের ৬ আসামিসহ মাওলানা তাজউদ্দিন ও মাজেদ ভাটকে আসামি করে ৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ঐ হামলার ব্যাপারে জঙ্গি শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর সিলেটের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট নুরে আলম সিদ্দিকীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলায় মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার স¤পাদক ইব্রাহিম আলী নিহত ছাড়াও তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক ও দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক, অ্যাডভোকেট মফুর আলী, অ্যাডভোকেট রাজ উদ্দিন, তুহিন কুমার দাস (মিকন), ফয়জুল আনোয়ার আলাওর, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, দলের নেতা কবির উদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট রাধিকা রঞ্জন চৌধুরী, এটিএম হাসান জেবুল, শওকত আলী, অ্যাডভোকেট শেখ মকলু মিয়া, প্রদীপ পুরকায়স্থ, তপন মিত্র, আজম খান, জুবের খান, জামাল চৌধুরী ও আব্দুস সুবহান আহত হন। আহতদের শরীরে এখনো গ্রেনেডের স্প্লিন্টার রয়েছে। 

নথিতে উল্লেখ করা হয়, হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড চট্টগ্রাম থেকে এক পাকিস্তানি নাগরিকের কাছ থেকে পাকিস্তানি জঙ্গি নেতা আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট সংগ্রহ করে। এরপর রাজধানী ঢাকার মুহাম্মদপুরস্থ মাজেদ ভাটের বাসায় সেটি মজুদ করা হয়। পরে জঙ্গী নেতা মুফতি হান্নানের মাধ্যমে গ্রেনেডটি সিলেটে নিয়ে আসা হয়। পাকিস্তানি জঙ্গী মাজেদ ভাটই এই গ্রেনেড সরবরাহ করে। 

এরপর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা করা হয় বলে মামলার নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। গ্রেনেড হামলার পরদিন এসআই এনামুল হক বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এস আই ফজলুল আলম ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি‘র এএসপি মুন্সী  আতিকুর রহমান মামলার তদন্ত করেন।

২০০৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সিআইডির পরিদর্শক জুবের আহমদ আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এতে মুফতি হান্নান, বিপুল, মুফতি মঈনুদ্দিন, মহিবুল্লাহ, রিপন ও পলাতক হিমুকে আসামী করা হয়। ২০১১ সালের ২ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক গ্রেনেড হামলার প্রকৃত নির্দেশ দাতা, প্ররোচণাদানকারী, গ্রেনেড সরবরাহকারী এবং আলী এন্টারপ্রাইজের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্যে সিআইডির এএসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা দ্বারা তদন্তের আদেশ দেন। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রওনকুল হক চৌধুরী মামলার পুনঃতদন্ত করে আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেন। কিন্তু আজো মামলার বিচার কার্য শেষ হলোনা।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি