১৯৩০ সালের আজকের দিনে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব জন্মগ্রহণ করেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। আসলে জন্ম না বলে আবির্ভাব বলাটাই শ্রেয়তর মনে করি। কেননা জন্ম হলে মানুষকে মৃত্যুবরণ করতেই হয়, এটা প্রকৃতির বিধান। কোনো কোনো মানুষ মরে গিয়েও বেঁচে থাকেন মানবজাতির হৃদয়ে। কর্ম করে যিনি বেঁচে থাকেন তাদের তো মৃত্যু হতে পারে না। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা এমনি একজন মহীয়সী নারী যিনি তার কর্মের মধ্যে বেঁচে আছেন। তাই তার জন্মদিনটা আবির্ভাব হিসেবেই বিবেচিত। তিনি সশরীরে বেঁচে থাকলে তার বয়স ২০২২ সালে ৯২তে প্রবেশ করত।
এই মহীয়সী নারী ইতিহাসের মহানায়ক বাংলাদেশের জন্মদাতা একই সঙ্গে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সহধর্মিণী। টুঙ্গিপাড়ার মিয়াভাই খ্যাত শেখ মুজিবের মহানায়ক ও বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠার পেছনের এক অনবদ্য কারিগর বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তার প্রেরণা উৎসাহ বঙ্গবন্ধুকে একটা জাতি রাষ্ট্রের বিনির্মাণে সাহস যুগিয়েছে। কোনো মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যদি সহধর্মিণীর সহযোগিতা না থাকে তবে সে এগিয়ে যেতে পারে না। বঙ্গবন্ধুও এগিয়ে যেতে পারতেন না, যদি বেগম মুজিবের সহযোগিতা না থাকত। একটা জাতিকে মুক্তির পথ প্রদর্শনে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনকারী শেখ ফজিলাতুন নেছার বহুমাত্রিক গুণাবলী বাঙালি জাতিকে অনন্য উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত করেছে স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। অত্যন্ত মার্জিত রুচি ও সংস্কৃতিমনা শেখ মুজিবকে জাতিসত্তা বিকাশে তার সহধর্মিণী অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন সর্বক্ষণ। রাজনীতির প্রচার-প্রচারণায় শেখ মুজিব দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বেগম মুজিব মাতৃস্নেহে নেতাকর্মীদের সামলে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আন্দোলন করতে গিয়ে জীবনের অধিকাংশ সময় জেলজুলুম সহ্য করেছেন, বেগম মুজিব তেমনি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে নেতাকর্মীদের সান্ত¾না দিয়েছেন। ৩২ নম্বর ছিল কার্যত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ঠিকানা। শেখ মুজিবকে বেগম মুজিব কখনো নিজের একক মানুষ হিসেবে জ্ঞান করেননি। তিনি মনে করতেন, শেখ মুজিব গোটা বাঙালি জাতির। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল এ জাতিকে পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্ত করা। সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বেগম মুজিব প্রেরণা যুগিয়েছেন সব সময়। সে প্রেরণা থেকে জন্ম নিয়েছে সাহসের। তাই শেখ মুজিব এক দুঃসাহসী খ্যাতির শিখরে পৌঁছে যেতে সক্ষম হন।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে নিয়ে বাংলাদেশে তেমন গবেষণা হয়নি। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী একুশটি বছর বাঙালি জাতি বিকৃত ইতিহাসের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ২১ বছরে বাংলাদেশের জন্মের প্রকৃত ইতিহাসকে বদলে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে ইতিহাসের মূলধারায় বাংলাদেশ উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু ঘটনাবহুল ব্যাপক ও বিস্তৃত ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ ছিল না। স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে শেখ ফজিলাতুন নেছার অবিস্মরণীয় অবদান সম্পর্কে তেমন একটা জানা সম্ভব হয়নি।
বঙ্গমাতার অপরিসীম অবদান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও চোখে পড়ার মতো নয়। এটা আমাদের জন্য খুবই বেদনার। তবে দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান কতিপয় বুদ্ধিজীবী, লেখক গবেষণার স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বঙ্গমাতা সম্পর্কে কিছুটা জানতে পেরেছি। এদের মধ্যে বেগম সুফিয়া কামাল, প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা, প্রয়াত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর জামাতা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়া অন্যতম। তাছাড়া শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণমূলক লেখা ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা গ্রম্হে শেখ ফজিলাতুন নেছার অবদান সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। তবে আমার কাছে এগুলো যথেষ্ট নয়।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই যে, এ উপমহাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তার সহধর্মিণী কস্ত্তরকার প্রসঙ্গ, জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে কমলা নেহরুর কথা, চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে তার স্ত্রী বাসন্তী দেবীর কথা যতটা ইতিহাসে আলোচিত সেভাবে বঙ্গমাতা সম্পর্কে আলোচিত হয়নি। তবে এইটুকু সান্ত্বনা যে, শেখ ফজিলাতুন নেছার পূর্বে ‘বঙ্গমাতা’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। ‘বঙ্গমাতা’ বলতে আমরা শেখ ফজিলাতুন নেছাকেই বুঝি। কিন্তু ‘ভারতমাতা’ অভিধাটি গান্ধী পত্নীর সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ‘ভারতমাতা’ বলতে ভারতকেই বুঝায়। তেমন জিন্নাহপত্নী রতন বাই জিন্নাহ'র সঙ্গে পাকিস্তানমাতা যুক্ত হয়নি। শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সঙ্গে ‘বঙ্গমাতা’ অভিধাটি যুক্ত করে যথার্থ কাজটি করতে সক্ষম হয়েছি। বেগম মুজিবের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি ভালোবাসা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাহসের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বঙ্গমাতা’ অভিধাটি যথেষ্ট মানানসই বলেই মনে করি।
শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জীবনটা ছিল সাদামাটা। কিন্তু তার আচার-আচরণে মাতৃভাবনার ভাবটি ছিল প্রবল। এক সমন্বিত নারীসত্তায় উদ্ভাসিত। অপূর্ব নারী মাধুর্য ও শুদ্ধ মাতৃত্বের ছবিটি যেন আলোকিত করে রাখত সবাইকে। বঙ্গবন্ধু জেল খাটলেও তার মধ্যে কোনো বিষাদ ছিল না। বরং গৌরব বোধ করতেন স্বামীকে নিয়ে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাতৃস্নেহে লালন করে জীবনকে কৃতার্থ করেছেন। বাঙালি জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে ভোগের ক্ষেত্র থেকে ঊর্ধ্বমুখে নিতে হবে- এই বোধ থেকেই তিনি মাতৃস্নেহে আপ্লুত হয়ে কর্মীদের সেবায় মনোযোগী হতেন। তার জীবনচর্চায় যে অপূর্ব ত্যাগ প্রকটিত হয়েছে তা সমগ্র নারী জাতির আদর্শরূপে বিভাসিতা। আমরা তাই গর্বিত এমন মায়ের জন্য। আজকের এই স্বাধীনতা ও স্বাধীন জাতির বিকাশমান ধারায় শেখ ফজিলাতুন নেছার নাম লেখা থাকবে স্বর্ণের অক্ষরে। জন্মদিনে এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক : রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য
