মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩১

চারিদিকে প্রযুক্তির বিস্ময়কর উল্লম্ফন দেখিতে পাই আমরা। দেশে এখন কোটি কোটি মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, এয়ারকন্ডিশনার, ফটোকপি মেশিনসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এইগুলি ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও চলিতে পারি না। ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে এতটাই সহজ করিয়া দিয়াছে যে, এই প্রযুক্তিহীন জগৎ আমরা এখন কল্পনাও করিতে পারি না। বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী বাজার-অর্থনীতিও বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের দখলে। প্রযুক্তি যেমন আমাদের অমৃত দিতেছে, তেমনি ইহার তলানিতে রহিয়াছে গরল, যাহার বিষে আমাদের প্রজন্ম নীলকণ্ঠ হইয়া উঠিবে। আমরা যেমন কোটি কোটি নূতন ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহার করিতেছি, তেমনি প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ ই-পণ্য নষ্ট হইতেছে। আর এই নষ্ট ই-পণ্যই সমগ্র বিশ্বের মতো আমাদেরও মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। 

বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, আমাদের দেশে প্রতি বৎসর ৩২ কোটি টন ইলেকট্রনিকস পণ্য ব্যবহার করা হয়। ফলে ইহা সহজেই অনুমেয় এই সকল পণ্য হইতে কী পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হয়! বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) গবেষণায় দেখা গিয়াছে, প্রতি বৎসর দেশে প্রায় ৪ লক্ষ টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়। ২০২৩ সালে ইহার পরিমাণ দাঁড়াইবে প্রায় ১২ লক্ষ টন। মনে রাখিতে হইবে, গত ১০ বৎসরে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়াছে ৩০ হইতে ৪০ গুণ। আগামী ১০ বৎসরেও ইহা ন্যূনতম ৫০ গুণ বাড়িবে। তখন কী দশা হইতে পারে—তাহা কি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা হইয়াছে? আমরা কি কখনো ভাবিয়া দেখিয়াছি এই বর্জ্যগুলি পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলিতেছে এবং ফেলিতে যাইতেছে?

ই-বর্জ্য লইয়া উদ্বেগ সমগ্র দুনিয়ারই। ই-বর্জ্য লইয়া কাজ করা বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট স্ট্যাটিসটিকস পার্টনারশিপের (জিইএসপি) এক হিসাব বলিতেছে, বিশ্বে প্রতি পাঁচ বৎসরে ই-বর্জ্য ২১ শতাংশ হারে বাড়ে। আশঙ্কার বিষয় হইল, ই-বর্জ্য অধিক জমা হইতেছে নিম্ন আয় ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে। আমাদের দেশও ক্রমশ ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হইতেছে। আমরা একঝলকে বুঝিয়া দেখিতে পারি, ই-বর্জ্যে কী কী ধরনের ক্ষতি হইতে পারে। ই-বর্জ্যে যেই ধাতব ও অধাতব উপাদানগুলি থাকে তাহা হইল, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা, রুপা, প্যালাডিয়াম, প্লাটিনাম, নিকেল, টিন, লেড, লোহা, সালফার, ফসফরাস, আর্সেনিক প্রভৃতি। 

বিজ্ঞানীদের দাবি, পরিবেশের সহিত এইগুলি মিশিলে তাহা নিশ্চিতভাবে নিদারুণ ক্ষতি করিয়া থাকে। এই ই-বর্জ্যে থাকা অ্যান্টিমনি মৌলটির কারণে চোখ, ত্বক, হৃৎপিন্ড ও ফুসফুসের ক্ষতি হইবার আশঙ্কা থাকে। ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু ফুসফুসের ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, পাকস্থলীর সমস্যা, আলসার, অ্যালার্জি প্রভৃতির জন্য দায়ী। কোবাল্ট হইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস, হৃৎপিন্ড ও চোখ। থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাজমা প্রভৃতির জন্যও কোবাল্ট দায়ী। ই-বর্জ্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিকর উপাদান হইল মলিবডেনাম। ইহা হইতে হাত, পা, হাঁটু, কনুই প্রভৃতি অঙ্গে ব্যথা সৃষ্টি হইতে পারে। বহু ইলেকট্রনিকস দ্রব্যে লেড বা সিসা ব্যবহৃত হয়। এই উপাদানটি জীবজগৎ ও পরিবেশের পক্ষে সবচাইতে ক্ষতিকর। এই উপাদানটি কোনোভাবে মানবদেহে প্রবেশ করিলে মস্তিষ্ক, কিডনির প্রভূত ক্ষতি হইতে পারে। সন্তান উৎপাদন ও ধারণক্ষমতার বিশেষ ক্ষতি এবং শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশও ব্যাহত হইতে পারে সিসার কারণে। এইভাবে আমরা লম্বা তালিকা করিতে পারি।

দুঃখজনকভাবে, নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের পরিবেশসম্মত ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এখনো আমরা গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। এখনো এই সমস্ত ই-বর্জ্যের স্থান হয় অন্যান্য গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে, আস্তাকুঁড় বা ডাস্টবিনে। সুতরাং আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই সচেতন হইতে হইবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও তাহা বাস্তবায়ন করিতে। কারণ, বাংলাদেশ যদি ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়, তাহা হইলে ২৫ বা ৫০ বৎসর পর আমরা নানান স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত একটি প্রজন্ম পাইব। উন্নত দেশ গঠনে ইহা বিশাল বড় প্রতিবন্ধকতাও বটে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন