শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হিরোশিমা ও নাগাসাকি ট্র্যাজেডি

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩৬

১৯৩৯ সালে হিটলারের নাত্সি বাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণের সাহাঘ্যে পোল্যান্ড দখলের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে এবং একটার পর একটা দেশ দখলে এনে তারা সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসতে থাকে। হিটলারের এই আগ্রাসি তত্পরতা কীভাবে প্রতিহত করা যায়, সে চিন্তা থেকেই এটম বোমার উদ্ভাবন। আর এজন্য ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করে। চুল্লি থেকে দুটি বোমা তৈরি করেছিল—‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাটম্যান’।

ম্যানহাটান প্রজেক্ট নামে এ চুল্লির জন্য ৫ লক্ষ একর জমি দখল করা হয়। এ প্রজেক্টে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং কর্মী মিলে প্রায় ৫০ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল। এ কাজে এত প্রকৌশলী, সামরিক বাহিনী ও কর্মচারী থাকলেও তাদের কেউ জানতেন না এখানে কী উদ্দেশ্যে কী কাজ চলছে। কাজটি চলত খুব সংগোপনে। কেবল বড় বড় বিজ্ঞানী ও বড় বড় সামরিক কর্মকর্তারাই জানতেন এ প্রজেক্ট সম্পর্কে। এমনকি আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানও এ প্রজেক্ট সম্পর্কে কিছুই জানতেন না—প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত।

ঐ পারমাণবিক চুল্লি ছিল পৃথিবীর প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক চুল্লি। পারমাণবিক চুল্লির প্রধান কাজ হলো নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তেজষ্ক্রিয় পদার্থের এটমকে ভাঙা। এটম ভাঙার প্রক্রিয়াকে বলে ফিশন। এখানে নিউট্রনকে বুলেট হিসেবে ব্যবহার করে তেজষ্ক্রিয় পদার্থের নিউক্লিয়াসে আঘাত করা হয়। পারমাণবিক চুল্লিকে ঘিরে সাত ফুট পুরু কংক্রিটের দেওয়াল ও ছাদ থাকে। নিচের মেঝেও থাকে একই রকম পুরু কংক্রিটের ঢালাই। চুল্লির ভেতরে কী হচ্ছে বাইরে থেকে টের পাওয়ার কোনো উপায় নেই। অথচ বাইরে থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। চুল্লির ভেতরে তাই বিশেষ ব্যবস্থায় টিভি ক্যামেরা বসিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে কম্পিউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষলগ্নে। জার্মানি ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে। জাপানও পর্যুদস্ত। যে কোনো মুহূর্তে আত্মসমর্পণ করবে। ঠিক এমন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা পৃথিবীতে শুধু তার আধিপত্য বিস্তার চালু রাখবার জন্য বর্বর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ভয়াবহ ইতিহাস সৃষ্টি করল। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। জাপানের পূর্ব দিগন্ত লাল সূর্য কেবল উঠি উঠি করছে। বন্দরনগরী হিরোশিমার ঘুম ভাঙছে পাখির কলগুঞ্জনে। এই শান্ত সোনালি ভোরে যুদ্ধের কথা ভাবা যায় না। এদিকে গত কয়দিন ধরে হিরোশিমাবাসী বিমান আক্রমণের সাইরেন শুনে আসছে। আজও অনেকের ঘুম ভাঙল এমন ধরনের সাইরেন শুনে। শহরবাসী সন্ত্রস্ত নয়নে দেখল খুব উঁচু দিয়ে কয়েকটি যুদ্ধ বিমান উড়ে চলেছে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সম্পূর্ণ একাকী উড়ে চলেছে অপর একটি বিমান, অল্প সময়ের মধ্যে সেটাও মিলিয়ে গেল দূর আকাশে। ৭টা ৩০ মিনিটে বিপদমুক্ত সাইরেন বেজে উঠল। বেলা আটটার দিকে পুনরায় তিনটা প্লেনকে একসঙ্গে দেখা গেল। সিভিল ডিফেন্সের লোকেরা ভাবল এগুলোও হয়তো আগের মতো কোনো পরিদর্শনে বেরিয়েছে। তাই সতর্ক সাইরেন আর বাজানো হলো না।

কিন্তু ভুল ভাঙল অল্প সময়ের মধ্যেই। দেখা গেল ঐ প্লেন-এরই একটা হঠাৎ যেন হিরোশিমার মধ্যগগনে নেমে এসেছে—ঠিক যেন বাজপাখির মতো। ১৯৪৫ সালে ৬ ও ৯ আগস্ট যে এটম বোমা ফেলা হয়েছিল, তাতে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর নিমেষের মধ্যে ধূলিসাত্ হয়েছিল। এই বোমার আঘাতে কত লোক নিহত ও আহত হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা কোনোদিনই জানা সম্ভব হবে না। যারা বেঁচে ছিল তাদেরও অনেকের ক্রমে ক্রমে মাথার চুল পড়ে যেতে লাগল, দাঁত ঝরে গেল, রক্ত গেল পাতলা হয়ে। শরীরের যে কোনো কাটা ঘা দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরতে লাগল। এমন ব্যাপক হারে এরকম বীভত্স, ভয়ংকর মৃতু্যর কথা মানুষ আর কখনো শোনেনি। এ বোমার আঘাতে দালানকোঠা পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। এ বিস্ফোরণে যে তাপ সৃষ্টি হয় তার মাত্রা ছিল প্রায় এক কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এবং পাঁচ কিলোমিটার পরিধির মধ্যে সব পদার্থ বাষ্পে পরিণত হয়েছিল। ভবিষ্যতে পৃথিবীতে আর এমন কোনো বিপর্যয় নেমে না আসুক। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার হোক মানব কল্যাণে। জয় হোক মানুষের শুভবুদ্ধির।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন