সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের একটি সত্তা জীব, অপরটি হচ্ছে মনুষ্যত্ব। মানুষ দেখলে চেনা যায়, মনুষ্যত্ব আচরণে অনুধাবন করতে হয়। সুশিক্ষা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। শিক্ষার আসল কাজ মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, জ্ঞানদান নয়। জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায়মাত্র। শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্ব অর্জন করা হয়। এই শিক্ষা পারিবারিক, একাডেমিক, সামাজিক শিক্ষা হতে পারে। শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধের উপায় ও মানব চরিত্রকে সুসমামণ্ডিত করে তোলে। জার্মান শিক্ষাবিদ জোহান ফ্রিডারিক হার্বাটের মতে, ‘আদিম ও নিচু প্রকৃতির অবদমন এবং উন্নত মানসিকতার উত্কর্ষ সাধনই নৈতিকতা’। নৈতিকতার শিক্ষা ও মূল্যবোধ মানবতাকে জাগ্রত করতে সহায়তা করে। মায়া-মমতা, বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সদাচার, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা—এসব মহৎ গুণ মনুষ্যত্বের একেকটি স্তর। মানুষের খোদা প্রদত্ত অন্তরের পবিত্রতা অর্জন করলে মনুষ্যত্ব অর্জিত হয়। এ পৃথিবী প্রকৃতির নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। কোথায় কোনো অনিয়ম নেই। মানুষকেও বিবেক-জ্ঞান-বুদ্ধি ও মনুষ্যত্ব নিয়েই চলতে হয়। এসবের একটু ব্যতিক্রম ঘটলেই মানুষ মনুষ্যত্ব হারাবে এবং সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গদ্যকার মোতাহার হোসেন চৌধুরী তার ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ নামক প্রবন্ধে মানুষ ও মনুষ্যত্বকে দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, মানুষের জীবসত্তা হলো ঘরের নিচতলা আর মনুষ্যত্ব হচ্ছে ঘরের ওপরতলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মনুষ্যত্বের ঘরে দোতলায় ওঠার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার দ্বারা মানুষ মনুষ্যত্বের স্বাদ খুঁজে পায় এবং শিক্ষা মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার পথ দেখায়। শিক্ষাই প্রকৃতিকে চেনার একমাত্র উপায়। এজন্যই বলা হয়েছে, ‘অশিক্ষিত মানুষ পশুর সমান’। একসময় শিক্ষাই ছিল জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু এখন বলা হয় সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। যে শিক্ষায় মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় না, সেই শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হতে পারে না। দেশে শিক্ষার হার, শিক্ষিতের হার বাড়লেও মানুষের মনুষ্যত্ব বাড়ছে না। মানুষ পরোপকারী জীব হলেও জাতি-গোষ্ঠী, মানুষে-মানুষে হিংসা-বিবাদ-বিদ্বেষ-সংঘাতে ছেয়ে আছে পৃথিবী। মানুষের সীমাহীন লোভের কারণেও মানবতা হারাচ্ছে। লোভ মানুষের চরিত্রের অবণতি ঘটায় এবং মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে অসত্ উপায় অবলম্বনের পথ দেখায়। লোভী মানুষ চরিত্রবান হতে পারে না এবং এ ধরনের মানুষ দেশ ধ্বংস করে। ‘লোভে পাপ পাপে মৃতু্য’ জেনেও মানুষ লোভ সামলাতে পারছে না।
দাম্পত্য, পারিবারিক ও সামাজিক কলহে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, পিতা-মাতা, ছাত্র-শিক্ষক একে অপরের হাতে নির্মমভাবে খুন হচ্ছে। সমাজ ও পরিবারের কেউ যেন কারো আপন নয়। আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় ইন্টারনেটের অপব্যবহারে অশ্লীলতার মহামারি শুরু হয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের এখন বড়ই অভাব। একসময় এ দেশে কোনো এলাকায় একটি খুন বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে পুরো এলাকা থমকে যেত। সর্বনাশ! খুন হয়েছে, মানুষ মরেছে—এ নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিল না। কিন্তু এখন বনের পশু-পাখি মায়ের কোলে নিরাপদ আছে বটে, কিন্তু মানব মায়ের কোলে শিশুরাও নিরাপদ নয়।
গণমাধ্যমে প্রতিদিন সামাজিক মূল্যবোধ ও মানুষের নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ের কাহিনি প্রকাশ ও প্রচারিত হচ্ছে। এখানে জাতীয় দৈনিক থেকে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার লাভনি আক্তার (৩৬) গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার দেহরক্ষী শাহ মৃদুল হাসান (২৩) মাথায় শটগান ঠেকিয়ে নিজে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। দুজনের আত্মহত্যার কারণ জানা না গেলেও ঘটনা এক সুতায় রহস্যে ভরা। এ ঘটনা পুলিশ প্রশাসনকে হতবাক করেছে। কেরানীগঞ্জের ডাকপাড়া গ্রামের সাগরের স্ত্রীকে উত্ত্যক্তে বাধা দেওয়ায় স্বামী সাগরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। টেকনাফের ইউএনও কাওসার সাংবাদিক সাইদুল ফরহাদকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করায় মহামান্য হাইকোর্ট তাকে মাস্তানের চেয়ে আরো খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন। বাগেরহাটের তেমা ইউনিয়নের বাশবাড়িয়া গ্রামের ২১ বছর বয়সি তরুণীকে মুখ বেঁধে ধর্ষণ করা হয়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ছিনতাইকারীদের হাতে সনজীব নামে এক ব্যবসায়ী খুন হন। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় স্বামীর পরকিয়া ধরা পড়ায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মালেকা আক্তারকে হত্যা করেন স্বামী।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় আব্দুল কুদ্দুস নামের এক আনসার সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভার রসুলপুরে পুত্ররা পিতা আলীকে হত্যা করে। নওগাঁর মহাদেবপুরে স্ত্রী হালিমা আক্তার আঁখিকে হত্যা করেন স্বামী আল-আমিন। ভৈরব পৌর শহরের উত্তরপাড়ায় বোনকে উত্ত্যক্ত করার বিচার চাওয়ায় ভাই হাসানকে কুপিয়ে জখম করে বখাটেরা। নোয়াখালীর চাটখিল স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সে ভর্তিকৃত রোগীকে ধর্ষণ করে মনজুরুল হায়দার রনি নামের এক বখাটে। রংপুরে প্রেমিকাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ায় সাজিদুল ইসলাম নামের এক ছাত্র গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। কিশোরগঞ্জে তিন সন্তানের জননীকে হত্যা করা হয়। পটুয়াখালীর গলাচিপায় তরুণীকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় এনে ধর্ষণ করেন রিয়াজ ও রাব্বি গাজী নামে দুই যুবক। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞানশিক্ষক মতিউর রহমানকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা। সুনামগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে খোকন নামের যুবককে খুন করে প্রতিপক্ষের লোকজন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে হোসেন নামের এক কৃষক এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মিরপুরে নজরুল নামের এক যুবককে খুন করা হয়। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে সজল বিশ্বাস নামের এক দোকান কর্মচারীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ঋণের ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পেরে দেড় বছরের শিশু এমরান ও ইভা নামের দুই শিশুকে বিক্রি করে দেন পিতা। এমন অসংখ্য ঘটনায় ভরা দেশ।
সিলেট শহরের শাহ মীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান, পুলিশের সোর্স আতউর রহমান ও আব্দুর রকিব মুক্তিপণ না দেওয়ায় হত্যা করেন। আদালতে তাদের ফাঁসির রায়ও হয়েছে। সিলেটে আব্দুল আহাদ নামের এক ওসি ৪৫০ কোটি টাকা ভারতে প্রাচার করায় বুলবুল নামের এক আইনজীবী তার নামে মামলাও করেছিলেন। এই আব্দুল আহাদ বিশ্বনাথ থানায় কর্মরত থাকাবস্হায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শেখ তাহির আলী হত্যা মামলাটি তদন্তে নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময়েও মামলাটির বিচার হয়নি। মেজর সিন্হা হত্যাকারী ওসি প্রদীপ, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফরহাদ হত্যা, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পাঁচ বছরেরর শিশু তুহিন, ঢাকার দর্জি বিশ্বজিত্ রায়, সিলেটে রায়হান হত্যা, এমসি কলেজে খাদিজা আক্তার নার্গিসকে প্রকাশে কুপিয়ে জখম, একই কলেজে একজন নববধূকে ধর্ষণের ঘটনাটি ছিল দেশের ইতিহাসে চরম বর্বর ও মনুষ্যত্বহীন কাণ্ড। ঢাকার পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে আদরের মেয়ে ঐশী ঠান্ডা মাথায় খুন করে। ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি, ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু, এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী চট্টগ্রামের মাহমুদা খানম মিতু, বরগুনার রিফাত হত্যা, ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিশা, রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় সাত বছরের শিশু সাদিয়া, হত্যা—এসব নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এসব ঘটনা সমাজের জন্য চরম বিপত্সংকেত।
সমাজের সব স্তরে মানবীয় গুণের দ‚র্ভিক্ষ চলছে। সততা ও মনুষ্যত্ব গুণের কদরের চেয়ে রূপের আদর-কদর বেশি। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, লোভ ও অশ্লীলতার আগ্রাসনে নৈতিক মূল্যবোধ ক্ষয় হয়ে মনুষ্যত্বে পচন ধরেছে। এর একমাত্র দাওয়াই হতে পারে শিক্ষা, সুশিক্ষা।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক
