বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গণপরিবহন নৈরাজ্য ও বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ০৮:৩৭

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়তি চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানাবিধ চাপে এমনিতেই জনজীবনে নাভিশ্বাস। তার ওপর পরিবহন খরচ বৃদ্ধি যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। গণপরিবহন নিয়ে এমনিতেই ভোগান্তির শেষ নেই। ভোগান্তির তালিকা দিনদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পরিস্হিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখানকার পরিবহনব্যবস্হা, ট্রাফিক ব্যবস্হাপনা, রাস্তার সার্বিক পরিস্হিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। যাচ্ছেতাইভাবে সবকিছু চলাটাই যেন অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। নাগরিক মানুষ সবচেয়ে অসহায় বোধ করে পরিবহনের জন্য অপেক্ষার সময়। সত্যি বলতে কি, গণপরিবহনের অব্যবস্হাপনা দুঃসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে অনেক আগেই। কোথাও যাওয়ার জন্য নাগরিকদের রাস্তায় নেমেই এক বিব্রতকর পরিস্হিতিতে পড়তে হয়।

গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তাড়া আছে কিন্তু যানবাহনের তীব্র সংকট। অফিসে যাওয়া, বিয়ে-দাওয়াত, পার্টিতে যাওয়া, এমনকি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া—প্রয়োজনীয় কোনো গন্তব্যেই যে সময়মতো পৌঁছানো যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাসে উঠতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এ অবস্হায় মানুষজনের ভোগান্তির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

যানজটের ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তা-ই নয়, শব্দ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিনদিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

সাম্প্রতিক এক গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে দিনে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। গত ১০ বছরে যান চলাচলের গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে সাত কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে, যা হেঁটে চলার গড় গতি (পাঁচ কিলোমিটার) থেকে একটু বেশি। বাংলাদেশের শহুরে জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বৃহত্তর ঢাকায় বাস করে। ঢাকা এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম। সুতরাং যানজট একটি স্হায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেওয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে ২০৩৫ সালে ঢাকার উন্নয়ন শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘টুয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা: এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শীর্ষক খসড়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময় নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে।

রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়েই চলছে। বর্তমানে রাজধানীতে রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ যানবাহন বেশি চলছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২৩০টি নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে কোনো শহরে মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ যান চলাচলের জন্য রাস্তা থাকা আবশ্যক।

এসব কারণেই যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া ট্রাফিকব্যবস্হা ঠিকমতো কাজ না করায় যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগব্যবস্হার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করাসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। কিন্তু এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয়, কাজ ততটা হয় না যে তা যানজটের বর্তমান হালই বলে দিচ্ছে।

বর্তমান নগরবাসীর স্হবির ও অচল এ অবস্হা দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এজন্য পরিবহন খাতে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্হিতি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য অবকাঠামো, সুশাসন অযান্ত্রিক পরিবহন, পরিবহনের পরিদর্শন ও ব্যবস্হাপনা, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন ও স্বাস্হ্যগত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য বন্ধ এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্হা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বিআরটিসিকে সত্যিকার অর্থে সচল করতে হবে।

ঢাকার জীর্ণশীর্ণ বাসগুলো সিটিংয়ের নামে ‘চিটিং’ করছে যাত্রীদের সঙ্গে। ব্যস্ত সময়ে লোকাল বাসগুলোও হয়ে যাচ্ছে সিটিং বাস। এতে এক দিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে, অন্য দিকে লোকাল বাসে সিটিংয়ের নামে স্বল্প যাত্রী বহন করায় শত শত যাত্রীর অপেক্ষাকে আরো দীর্ঘতর করছে তারা। মানহীন ভাঙাচোরা রংচটা বাস, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানা অনিয়মের বেড়াজালে যাত্রীদের বন্দি করছে। সেবা নয়, মুনাফাই এদের আসল উদ্দেশ্য। এ অবস্হায় একটি গতিশীল পরিবহনব্যবস্হা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসিকে সচল করতে হবে।

দেশে যদি সত্যিকার অর্থে গণপরিবহন বলে কিছু থাকত তাহলে বেসরকারি বাস মালিকরা যে নৈরাজ্যকর অবস্হা তৈরি করতে পারত না, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, গণপরিবহন ব্যবস্হা গড়ে উঠতেও এই চক্র প্রবল বিরোধিতা করে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্হার (বিআরটিসি) বাস চলাচলেও চরম অসহযোগিতা করে পরিবহন খাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বজায় রাখছে বেসরকারি পরিবহন ব্যবসায়ীরা। অন্য দিকে বিআরটিসি নিজেও যেন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি চরম অব্যবস্হাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্রমাগত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিআরটিসি বিকল্প পরিবহন ব্যবস্হা হিসেবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।

একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্হা গড়ে না ওঠায় বেসরকারি পরিবহন মালিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন। পরিবহন খাতকে নানাভাবে জিম্মি করে রাখছে। এ অবস্হা থেকে উত্তরণের জন্য বিআরটিসিকে সচল করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কাজটি যে অতটা সহজ নয় তা তো এর আগের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই পরিষ্কার। বিআরটিসিকে কোণঠাসা করতে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা এককাট্টা। অথচ ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশবলে রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসির বাস দেশের যে কোনো স্হানে চলাচলের অধিকার রাখে। সরকার দেশে স্বল্পমূল্যে দ্রুত, দক্ষ, আরামপ্রদ, আধুনিক ও নিরাপদ সড়ক পরিবহনব্যবস্হা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে আশির দশকে বিআরটিসি বাস সেবা চালু করে। কিন্তু এর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে নানা কুচক্রী মহলের দৃষ্টি পড়ে। ২০০৪ সালে তত্কালীন জোট সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। পরবর্তীকালে এই চুক্তির দোহাই দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন রুট থেকে বিআরটিসির বাস উঠিয়ে দেওয়া হয়।

রাজধানীতেও বিআরটিসির পরিবহনসেবা ক্রমে ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে। যদিও প্রতিটি সরকার এসেই নতুন করে বিআরটিসিকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। বর্তমান সরকারও বেশ কয়েক দফা বিআরটিসির নতুন বাস রোডে নামায়। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই অজানা কারণে বাসগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাসে সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেই তা মেরামত না করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাস মেরামতের চেয়ে নতুন বাস কেনার দিকেই আগ্রহ বেশি বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের। এতে টুপাইস কামানো যায়। তাছাড়া গণহারে লিজ দেওয়ার ফলেও বিআরটিসিতে চলছে যাচ্ছেতাই কারবার।

আসলে মুক্তবাজারের নামে বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এখন পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে। রাজধানীতে প্রায় ২২ হাজার ছোট-বড় বাস চলে। এসবের মালিক ২ হাজার জন। দেখা যাচ্ছে অল্প কিছু মানুষ রাজধানীর সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্হা নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যবস্হা নিতে হলে সারা দেশে বিআরটিসির বাস চলতে দিতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যায়। জনস্বার্থে বিআরটিসিকে সচল করা এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক প্যারালাল গণপরিবহনব্যবস্হা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। সরকারকে মনে রাখতে হবে মুষ্টিমেয় লোকের দুর্নীতি, লোভ ও লাভের কারণে গণপরিবহনের নৈরাজ্য আমাদের নিয়তি হতে পারে না।

ঢাকার রাস্তায় একই সঙ্গে চলছে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ফলে এক জগাখিচুড়ি অবস্হার কারণে যানজট আরো প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো প্রয়োজন। সড়কপথের উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নৌপথগুলো চালু করা দরকার। নৌপথে যাতায়াত অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং স্বস্তিদায়কও বটে। এজন্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ অন্য নদীগুলোর দখল দূষণ বন্ধ করতে হবে।

ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোতেও নৌ-রুট চালু করা যায়। গণপরিবহনের অব্যবস্হাপনা এবং যানজট দূর করে স্হবির ঢাকাকে বদলে না দিতে পারলে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভিশন-২০২১-এর কথা বলা হচ্ছে খুব জোরেশোরে। কিন্তু একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানীকে অচলাবস্হায় রেখে তা আদৌ সম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন