বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভিন্ন জেলায় চাকরি করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকের কথা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৫:০২

মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক সাকুল্যে প্রারম্ভিক বেতন পান মাত্র ১২৭৫০ টাকা। পঞ্চাশ হাজার টাকাতেও যেখানে সংসার চালানো যায় না, সেখানে একজন শিক্ষক কীভাবে ঐ টাকায় তাঁর সংসার চালাবেন? শিক্ষকতা যেহেতু পেশা নয়, ব্রত। তাই শিক্ষকদের আমিষের প্রয়োজন নেই, শিক্ষকদের জন্য বিলাসিতাও নয়। তাই নিজ বাড়িতে বাস করে যাঁরা শিক্ষকতা করছেন তাঁরা না হয় কচুপাতা, লাউপাতা, ডাল, ভর্তা দিয়ে মোটা চালের ভাত খেয়ে কোনোমতে জীবন বাঁচাবেন। কিন্তু যাঁরা নিজ বাড়ি থেকে ভিন্ন জেলায় ১০০ কিলোমিটার থেকে ৯০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে শিক্ষকতা নামক ব্রত পালন করছেন তাঁদের বেলায় কী উত্তর হতে পারে? 

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ সুপারিশের ক্ষমতা এনটিআরসিএ-এর হাতে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত তিনটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষক দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে চাকরি করছেন। আমি তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলার দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের একটি দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পেয়ে যোগদান করি চলতি বছরের ফেব্র‚য়ারিতে। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। এত দূরে নিয়োগ পেলেও নামমাত্র ১০০০ টাকা বাড়িভাড়া আর ৫০০ টাকা চিকিত্সাভাতা ছাড়া দুর্গম ও দ্বীপাঞ্চল হিসেবে ঝুঁকিভাতাটাও পাই না। প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো সম্মানী দেওয়া হয় না। কেটে কুটে সাকুল্য বেতন আমার ১২৭৫০ টাকাই। যোগদান করার পর ইতিমধ্যে বাসভাড়া বেড়েছে দুইবার। আবার সাগর পাড়ি দিতে হয় নৌযানে। সে নৌযানের ভাড়াও বেড়েছে তিনবার। আগে আমার একার বাড়ি যাওয়া-আসার জন্য ব্যয় হত কমপক্ষে চার হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে পাঁচ হাজারের ওপর লাগবে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। তাই পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, কারখানার উত্পাদন খরচ বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রয়োজনীয় সব নিত্যপণ্যের দাম। এই স্বল্প বেতনে মাসে কিংবা দুই মাসে একবার বাড়ি যাওয়া-আসা, বাড়িভাড়া, খাওয়ার খরচ, মোবাইল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় খরচ বাবদ যে টাকা লাগে তা কোনো কিছুতেই বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য হচ্ছে না। কিছুতেই অঙ্ক মেলাতে পারি না। 

অন্য সব চাকরিতে বদলি ব্যবস্হা আছে। এমনকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজ উপজেলাতেই নিয়োগ দেওয়া হয়, তবু তাদের বদলি ব্যবস্হা আছে। অথচ এখানে সে বদলি ব্যবস্হাটুকুও নেই। কী নির্মম পরিহাস আমাদের পেশার সঙ্গে! ছোটবেলার একটা কথা খুব মনে পড়ছে। আমার গ্রামের একটা ছেলেকে অন্য গ্রামের এক ছেলে মেরেছিল। যে মেরেছিল সে ছেলেটার ওপর খুব রাগ আর জেদ চেপে বসেছিল আমাদের। যে মেরেছিল সে বেশ কিছুদিন আর আমাদের গ্রামে আসেনি। তাই একদিন ওদের গ্রামের অন্য একটি ছেলে আমাদের গ্রামে এলে ওকে ধরে গাছের সঙ্গে বেঁধে যখন মারতে যাব তখন ছেলেটি জানতে চেয়েছিল, ‘আমাকে মারছ কেন? আমার কী অপরাধ?’ জবাবে আমরা বলেছিলাম, ‘তোর অন্য কোনো অপরাধ নেই। তোর বাড়ি অমুক গ্রামে এটাই তোর অপরাধ।’ 

তেমনি আমার কাছে মনে হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ওপর জোর করে জুলুম করা হচ্ছে। অপরাধ না করেও অপরাধের সাজা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এ পেশায় এসেছি এটাই কি আমাদের অপরাধ? দেশের এত উন্নয়ন হচ্ছে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে এখন গাড়ি চলছে। কর্ণফুলী টানেলের কাজ প্রায় শেষ, মেট্রোরেল চূড়ান্ত উদ্বোধনের অপেক্ষায়, এক্সপ্রেস ওয়ে হচ্ছে, বড় বড় ফ্লাইওভার হচ্ছে। আরও কত কী! দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উলিখিত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের চেয়ে বেশি নয়। 

সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর লেখায় পড়েছিলাম ‘ধান দিয়া কী অইব জান যদি না থাকে’। সবকিছুর আগে তো বাঁচা। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্যমতে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি জড়িত। যদি আর্থিক সক্ষমতা না থাকে, তবে মেনে নিলাম। কিন্তু সরকার অন্তত দূরবর্তী বদলি প্রত্যাশী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাজেট বিহীন ঐচ্ছিক বদলির ব্যবস্হা চালু করলে আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন থাকবে না। কেননা স্বল্প বেতনে নিত্যপণ্যের ঊর্ধগতিতে ভিন্ন জেলায় চাকরি করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা দিশেহারা। 

এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক, পূর্ব সন্দ্বীপ ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন