রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৯:০৫

এই বিশ্বজগৎ এক অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ লীলাক্ষেত্র। ভারসাম্যকে আমরা ‘সীমা লঙ্ঘন না করিবার’ সহিত তুলনা করিতে পারি। অর্থাৎ ভারসাম্য ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ সীমা লঙ্ঘন করা না হয়। একটি জলযান যদি ১০০ জনের ভার বহিবার ক্ষমতা রাখে এবং সেই সীমা লঙ্ঘন করিয়া যদি দ্বিগুণ-তিন গুণ যাত্রী তোলা হয়, তখন সেই জলযানের ভারসাম্য নষ্ট হইবে এবং সেই সময় যদি ঝড় উঠে, তাহা হইলে সেই জলযানটির বড়ই দুর্ভোগ দেখা দেয়।

আজকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেই অবস্হা পরিদৃষ্ট হইতেছে, ইহার মধ্যে রহিয়াছে দূরদর্শিতার অভাবের দগদগে চিত্র। ঋণ তো করিতেই হয় একটি রাষ্ট্রকে। বিশ্বের সবচাইতে বড় অর্থনীতির দেশসমূহকেও প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে বিপুল ঋণ লইতে হইয়াছে। কিন্তু সেই ঋণের অর্থ যদি প্রোডাকটিভ কাজে না লাগাইয়া উহার একটি বড় অংশ বিভিন্ন মতলবি প্রকল্পে ব্যয় করা হয় এবং উহার মাধ্যমে গুটিকয়েক লুটেরাদের জন্য লুটপাটের ব্যবস্হা করা হয়, তাহা হইলে ঋণের উদ্দেশ্য ও সেই দেশটির অর্থনীতির ভারসাম্য বিনষ্ট হইবেই। আর সেই সময় যদি ঝড় উঠে, অর্থাত্ বিশ্বব্যাপী মহামারি এবং তাহার রেশ মিলিয়া যাইবার পূর্বেই তাত্পর্যপূর্ণ একটি যুদ্ধ ও জ্বালানি-সংকট দেখা যায়, তাহা হইলে অবস্হা দাঁড়ায়—‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এই অবস্হায় প্রথম প্রশ্ন জাগে, এই সকল দেশে যাহারা লুটপাট করিয়াছে, তাহারা কোথায় এখন? এই পৃথিবী যাহারা পরিচালনা করেন, তাহাদের বেশির ভাগেরই বয়স পঞ্চাশের উপরে। সুতরাং তাহারা অভিজ্ঞতায় খাটো নহে। তাহার পরও একটি রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় তাহারা দূরদর্শিতার পরিচয় কেন দেন নাই? যখন তাহাদের সুসময় ছিল, তখন ঋণের ডালি সাজাইয়া আলেয়ার মতো আসিয়াছে অনেকে। রাষ্ট্রের বিবিধ ক্ষেত্রের প্রশংসায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করিয়াছে। জলে-স্হলে অন্তরীক্ষে ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে সেই সকল প্রশংসার শতকোটি অক্ষর। এই সকল রাষ্ট্রে ক্ষমতায় যাহারা থাকেন, তাহারাও নিশ্চয়ই উপভোগ করেন এই সকল প্রশংসার অপূর্ব বর্ণচ্ছটা। কিন্তু যেই হেতু এই সকল রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যের সীমা ইতিপূর্বেই লঙ্ঘন করা হইয়াছিল, সুতরাং যখন বিশ্বের আকাশে ঝড় উঠিল, তখন তাহাতে সীমা লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রগুলির টালমাটাল অবস্হা শুরু হইল। আর তখনই শুরু হইল সীমালঙ্ঘনের শাস্তি এবং জলযানের সারেং এই ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারটি বুঝিয়াও যদি এড়াইয়া যান, তাহা হইলে ঐ জলযানটি তখন এই সকল ভুল পদক্ষেপের কারণে পরিচালন-অযোগ্য হইয়া উঠে। সবচাইতে ভালো ক্যাপটেনও তখন উহাকে সামলাইতে পারিবেন না। আর যখন এই রকম বিপদ ঘনাইয়া উঠে, তখন সবচাইতে আগে ভাগিয়া যায় সুবিধাভোগীর দল।

পৃথিবীতে এই সকল বিপদাপন্ন দেশগুলিতে যাহা ঘটিতেছে, তাহা দেখিয়া মনে হয়, ক্ষমতায় যাহারা আছেন তাহারাই যেন সকল কৃতকর্মের জন্য দায়ী। কিন্তু আমরা যদি এক মিনিট থামিয়া চিন্তা করি তাহা হইলে উপলব্ধি করিতে পারিব, যখন সুসময় ছিল, তখন এই সকল দেশের ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রশংসার বল্গাহীন ঘোড়া এমনভাবে ছুটিত যে, ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ শুনাইলেও ইহা বলা অতু্যক্তি হইবে না যে, তাহারা যেন প্রশংসায় ‘পঞ্চমুখ’ নহে ‘অষ্টমুখ’ ছিলেন। কিন্তু এখন তাহারা কোথায়? আর যাহারা ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি আমলে না লইয়াও প্রশংসার বাণীতে আপ্লুত হইয়া দাম্ভিকতা প্রকাশ করিতেন, তাহারা যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ভাবিতে থাকিল— ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে—/ এরে পরতে গেলে লাগে, এরে ছিঁড়তে গেলে বাজে।/ কণ্ঠ যে রোধ করে, সুর তো নাহি সরে—।’ দুঃখজনকভাবে, এই সকল ক্ষমতাসীনের আমলে যেই হারে কর্জ করিয়া অর্থনীতিকে স্ফীত করা হইয়াছিল এবং কীভাবে গুটিকয়েক মানুষের পকেটস্হ হইয়াছিল, তাহা তোষামোদকারীরা বুঝিতে দেন নাই। কিন্তু প্রশ্ন হইল, যাহার জানিবার কথা তিনি তো সব জানিতেন। তিনি কেন সব জানিয়াও গা ভাসাইয়া দিলেন? অতঃপর যখন দুর্দিন আসিল, যখন শিরদাঁড়া নু্যব্জ হইল, ত্বকে বলিরেখা দেখা দিল, তখন তাহার পাশে কেহ থাকিল না। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পঙ্ক্তি দুইখানির মর্ম উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন—‘সুসময়ে বন্ধু বটে অনেকেই হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়।’ 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন