শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দেশভাগে ঘরছাড়া, ৭৫ বছর পর পাকিস্তানে ফিরলেন বৃদ্ধা 

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২, ২১:১৪

৯০ বছর বয়সী রীনা ছিব্বার ভার্মা গতমাসে এক অসম্ভব যাত্রা শুরু করেন। তার বয়স ও অসুস্থতাকে হার মানিয়ে প্রায় ৭৫ বছর পর পাকিস্তানে তার পৈত্রিক ভিটায় পৌঁছান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ভারতীয় উপমহাদেশ ত্যাগের পূর্বে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুটি রাষ্ট্রে ভাগ করে দিয়ে যায়। এক, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত, দুই মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান। 

সে সময় ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য হয়। যার পরিমাণ অন্তত দেড় কোটি। এই বিভাজনকে কেন্দ্র করে দাঙ্গায় অন্তত ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার বড় দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ভারত ও পাকিস্তান তাদের সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জারি করে। এর ফলস্বরূপ বহু মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজন এমনকি তাদের নিজ বাড়িতে যেতে পারেননি।

এদেরই মধ্যে একজন এই ভার্মা, যিনি ১৫ বছর বয়সে জন্মস্থান রাওয়ালপিন্ডি ছেড়ে ভারতের পুনেতে চলে যান। তখন থেকেই তিনি শত্রুরাষ্ট্রে অবস্থিত পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পুষে রাখেন। 

'আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আমি আবার ঘরে ফিরে এসেছি। মনে হচ্ছে যেন গতকালই এইখানে ছিলাম', ভার্মা টেলিফোনে আল জাজিরাকে বলেন।

তিনি এখনও সেইদিনের কথা স্মরণ করেন যেদিন তারা স্বপরিবারে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। তার পরিবারের কেউই ৭৫ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারেনি। দেশবিভাগের ফলে যে পরিমাণ রক্তপাত ঘটে তা শুনে তিনি বিমর্ষ হন। যদিও তার পরিবার কোন ধরণের জিঘাংসার শিকার হন নি।

সবসময়ই তিনি চেষ্টা করে আসছেন তার পিতৃভূমিতে ঘুরে আসতে। 

১৯৬৫ সালে তিনি প্রথম পাসপোর্ট করেন এবং নানা কারণে তার সেই যাত্রা অসম্পন্ন থেকে যায়। ২০২০ সালে তিনি আবারও চেষ্টা চালান এবং পাসপোর্ট রিনিউ করেন। কিন্তু এবারও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় করোনাভাইরাস।

কিন্তু এরমধ্যেই তিনি ফেসবুকে একটি গ্রুপ 'ইন্ডিয়া পাকিস্তান হেরিটেজ ক্লাব' এর সংস্পর্শে আসেন। যারা ভার্মার রাওয়ালপিন্ডি ভ্রমণের ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

ওই ফেসবুক গ্রুপের জহির ও ইমরান নামের দুই পাকিস্তানি ব্যাক্তি এই দায়িত্বে এগিয়ে আসেন। ভ্রমণকালে সীমান্তে দুই দেশের নাম দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

এক সময়ে পুরো অঞ্চলটি একত্রিত থাকা সত্বেও এখন একটি সীমান্ত দুটি দেশকে বিভাজিত করে ফেলেছে। চাইলেও যখন খুশি এই সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব নয়। আল জাজিরাকে বলেন ভার্মা।

৭৫ বছর পৈত্রিক নিবাসে ফিরলেন বৃদ্ধা

তিনি পাকিস্তান পৌঁছালে নানাভাবে উষ্ণ আন্তরিক অভ্যর্থনা পান যা তিনি আশা করেননি বলে জানান। 

ভার্মাকে সাদরে স্বাগত জানানোর সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকগণ একে অন্যকে শুভেচ্ছা ও ভালবাসার বার্তা জানায়।

ভার্মার সেই পৈত্রিক ভিটায় বর্তমানে থাকেন মুজাম্মিল হুসেইন। ভার্মার সম্মানে তিনি সেই বাসার নাম রাখেন প্রেম নিবাস। যেই গলিতে বাড়িটি অবস্থিত তার নাম এখন প্রেম গলি। হুসেইন তার বাড়িতে সম্মানপূর্বক 'রীনার বাড়ি' নামক একটি নেমপ্লেট ও লাগান।

ভার্মা বলেন, আমার মনে হচ্ছিল বাড়িটিতে যেন আমার সব আত্মীয় স্বজনকে দেখতে পাচ্ছিলাম যদিও তারা জীবিত নেই। বাড়িয়ে বলা মনে হলেও আমার মনে হচ্ছিল তারা এখানেই আছে। 

ভার্মা দুই দেশের মধ্যকার সম্প্রীতি বর্ধনের উদ্দেশ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

ইত্তেফাক/এসআর