মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আইনের শাসন বজায় রাখতেই হবে

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৩:৪৫

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে ফ্লোরিডা। রাজ্যটি ‘আমেরিকান ফল্ট লাইন’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে উঠেছে, যাকে বলা হচ্ছে মার্কিন রাজনৈতিক ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে যা ঘটানো হয়েছিল—তা ছিল একুশ শতকের শুরুতেই মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর প্রথম আঘাত। চীনো-ক্লাড মিলিশিয়া, যা কি না রজার স্টোন নামের ডানপন্থি রাজনৈতিক উসকানিদাতা কর্তৃক সংঘটিত হয়, মিয়ামি-ড্রাড কাউন্টিতে একটি অফিসে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। যার উদ্দেশ্য ছিল বিতর্কিত ব্যালটের পুনর্গণনা বন্ধ করা, যেই গণনায় হয়তো দেখা যেত আল গোর সত্যিকারের বিজয়ী।

নির্বাচনী বিদ্রোহের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠা ব্র‚কস ব্রাদার্স রায়ট ছিল কেবল একটি শুরুর ধাক্কা। বড় বিস্ফোরণ ঘটে কয়েক সপ্তাহ পর। কালো পোশাক পরিহিত সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ জন ডানপন্থি আইনবিদ ফ্লোরিডার ব্যালট পুনর্গণনা বন্ধ করে দিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশের হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব তুলে দেন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। গণতন্ত্রের ওপর এই ধাক্কার পর থেকেই প্রকৃত পক্ষে আমেরিকা একটি বড় রকমের আফটারশকে ভুগছে। গত সপ্তাহে সানশাইন স্টেটে পরিলক্ষিত হলো আরেকটি আগ্নেয়গিরি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাম বিচের উপকূলীয় প্রাসাদ মার-এ-লাগোতে এফবিআই হানা দেয়। এই অভিযান বেশ তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির ক্ষোভের রিখটার স্কেল উঠেছে অনেক উঁচুতে।

তাত্ক্ষণিক জল্পনাকল্পনায় যেসব খুব চাউর হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, পরবর্তী সম্ভাব্য নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্পের প্রভাবকে খর্ব করার জন্যই এই অভিযান। বেশির ভাগ আলোচনাই ঘুরপাক খাচ্ছে এই বিষয়টি নিয়ে। মনে রাখতে হবে, ৬ জানুয়ারির ঘটনার পর ট্রাম্পকে দুর্বল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাম উঠে এসেছে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসেন্টিসের—ভোটের পাল্লা ভারি যার দিকে।

যা হোক, সম্ভাব্য প্রসিকিউশনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে—ফেডারেল কর্তৃপক্ষ সাবেক প্রেসিডেন্টের বাসায় অভিযান চালানোর অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে যে নজির সৃষ্টি করল—সেটা রাজনৈতিক নয়। ৬ জানুয়ারির ঘটনার মাত্র ১৮ মাস অতিবাহিত হয়েছে। মার্কিন প্রজাতন্ত্র কি আরো একটি ‘বড়’ ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার এবং প্রমাণাদির ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্তের সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতা কি নতুন করে কোনো বড় ঘটনরা জন্ম দিতে যাচ্ছে?

আমি দীর্ঘদিন ধরে ভেবে আসছি, প্রসিকিউশনের ফলে বহু নেতিবাচক দিক সামনে আসবে। আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা ট্রাম্পের অবস্থান ও তার সমর্থকপক্ষকে শক্তিশালী করবে। তাছাড়া এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকিও প্রবল। বিশেষ করে, রক্ষণশীল আমেরিকানদের আন্দোলন। এটা স্মরণে রাখতে হবে যে, প্রাউড বয়েজ এবং ওথ কিপারের মতো মিলিশিয়াদের এখন আধাসামরিক শাখা রয়েছে।

৬ জানুয়ারি ঘটনায় বিদ্রোহমূলক অপরাধপ্রবণতা প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির প্রয়োজনে ট্রাম্পের বাসায় তদন্ত করতে আসে এফবিআই। এই তদন্তের বিষয়ে বলা হচ্ছে, এটা যাচাই করা হচ্ছে যে—ট্রাম্প সংবেদনশীল সরকারি নথি ভুলভাবে ব্যবহার করেছেন কি না; যেগুলো জাতীয় আর্কাইভে হস্তান্তর করা উচিত ছিল তার।

ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান ইতিহাস সম্ভবত একটি বিশেষ নির্দেশিকা প্রদান করে। বিশেষ করে, নাগরিক অধিকার নিয়ে চরম যুদ্ধ। ফেডারেল সরকারের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী দক্ষিণ গভর্নরদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল যারা তাদের স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিচ্ছিন্নকরণের দাবিতে ফেডারেল আদালতের আদেশ মানতে অস্বীকার করে আসছিল। অনাচারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নের মুখে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ও কেনেডি দক্ষিণাঞ্চলে সৈন্য মোতায়েনের পথে হেঁটেছিলেন। সুতরাং, সতর্কতা সত্ত্বেও ফেডারেল অনমনীয়তা আরেকটি কনফেডারেট বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে।

স্নায়ুযুদ্ধের বছরগুলোর রাজনীতিকে একটি মডেল হিসেবে নেওয়া যেতে পারে, যার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা একত্রিত হয়ে কাজ করেছে। ওয়াটারগেট সংকটের সময়ও এমনটিই দেখা গেছে। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল—দোষী-অভিযুক্ত-অপরাধী প্রেসিডেন্টকে বিতাড়িত করা। একই অবস্থা দেখা গেছে ৬০-র দশকের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলোতেও। শেষবার আমেরিকা যখন এমন দীর্ঘস্থায়ী বিভেদ-বিভক্তির মধ্যে ছিল, তখন ওয়াশিংটনে দেশপ্রেমিক দ্বিদলীয়তার চেতনা বিরাজ করেছিল। কিন্তু হায়! বর্তমান সময়টা ভালো যাচ্ছে না মোটেও। ১৮৬০-১৯৬০-এর ঘটনাগুলোকেই তুলে আনছে। ক্যাপিটল হিলের তীব্রতা, টেক্সাসের মতো রাজ্যে ফেডারেল কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিপর্যয়ের চিত্র আজ সুস্পষ্ট।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, চার্লসটন হারবারের ফোর্ট সামটার নয় মার-এ-লাগো, যেখানে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের প্রথম সাইরেন বেজে ওঠে। কিংবা আমি বিশ্বাস করি না যে, আমেরিকার বর্তমান ভগ্নদশা অসহনীয়ভাবে সেই ভয়ঙ্কর দাবানলের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। তবুও শার্লটসভিলে নব্য-নাৎসি সমাবেশ থেকে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যা পর্যন্ত মুহূর্তগুলোতে ফ্ল্যাশপয়েন্টগুলোর একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কাইল রিটেনহাউসের বিচারে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া থেকে শুরু করে একাধিক গোলাগুলির ঘটনা পর্যন্ত—অর্থাৎ ৬ জানুয়ারির পর রো বনাম ওয়েডের পতন পর্যন্ত।

আব্রাহাম লিঙ্কন একদা ‘দ্য পার্পচুয়েশন অব আওয়ার পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউশনস’ শিরোনামের একটি বক্তৃতায় যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সংবিধান ও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখা হলো ‘আমাদের জাতিগত রাজনৈতিক ধর্ম’। এটিই মূলত শেষ পর্যন্ত পথনির্দেশক হওয়া উচিত, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন ট্রাম্পের বিচারকার্যের ওপর বিশেষ ভরসা রাখার প্রয়োজন। এছাড়া বিকল্প কি? লিংকনের আধুনিককালের পার্টির গণতন্ত্রবিরোধী প্রবণতা কি ফক্স নিউজের উসকানিমূলক ব্লোহার্ডস ও মাগা জনতার হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করছে?

মার-এ-লাগোর দরজায় কড়া নেড়ে এফবিআই দেখিয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানা বন্ধ করা কতটা কঠিন হবে। তার প্রেসিডেন্সির সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত প্রবণতার যে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে; চলমান ট্রাম্প-প্রভাব লম্বা সময়সীমা ধরে টিকে থাকবে। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের ডানপন্থিদের ধাক্কায় এবং রিপাবলিকান পার্টির রাডিক্যালাইজেশনের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে—যখনই ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করার কথা ওঠে শেষ পর্যন্ত তা আরো বেশি উগ্রবাদী পরিবেশের রূপ ধারণ করে। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও, আমেরিকার মহান আইনের মহিমাকে সমুন্নত রাখতে এই মুহূর্তে ব্যর্থ হলে ট্রাম্পিফিকেশনের ঝুঁকি আরো বাড়বে।

লেখক : সিডনি ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো; হোয়েন আমেরিকা স্টপড বিং গ্রেট: এ হিস্ট্রি অব দ্য প্রেজেন্ট-এর লেখক

‘দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ থেকে

ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন