শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির সকল ভোগান্তি দূর হউক

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ০৫:০৮

গত দেড় বৎসরে শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করিতে অভিভাবকেরা নানানভাবে হেনস্তার শিকার হইয়াছেন। ইতিপূর্বে আমরা এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির ভোগান্তি দূর করিতে যথাযথ ব্যবস্থা লইবার কথা বলিয়াছিলাম। আমরা দেখিয়াছি, স্কুলে ভর্তি ইচ্ছুক প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্য এই সমস্যা গলার কাঁটার মতো বিঁধিয়া ছিল।

গত বৎসর পহেলা জানুয়ারি হইতে স্কুলে ভর্তি, এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন, নূতন পাসপোর্টের জন্য আবেদনসহ আরো কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হইয়াছিল; কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা বলিতেছিলেন, অনলাইনে আবেদন করিবার প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে তাহাদের ব্যাপক মাত্রায় দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে। নিয়ম অনুযায়ী—২০০১ সালের পর যাহাদের জন্ম, তাহাদের জন্মনিবন্ধন সনদ করিতে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন নম্বর প্রয়োজন হইতেছিল। কাজেই সন্তানদের জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করিতে গিয়া বাবা-মাকেও নূতন করিয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির প্রয়োজন পড়িতেছিল; কিন্তু যাহার বাবা নাই, কিংবা বাবা-মায়ের সহিত বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়াছে, উভয়ের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ নাই এবং যাহারা পথশিশু—তাহারা কী করিয়া জন্মসনদ পাইবেন? রাষ্ট্র তো কোনো শিশুর বাবা-মায়ের সমস্যার কারণে শিশুটির রাষ্ট্রীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করিতে পারে না।

আশার কথা হইল, বিভিন্ন লিখালিখি, বিশিষ্টজনদের মতামত এবং মহামান্য হাইকোর্টের নজরদারির ফলে গত ২৭ জুলাই হইতে এই সমস্যার সুরাহা হইয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। ‘রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন’ জানাইতেছে, এখন হইতে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করিতে গেলে সফটওয়্যারে মা-বাবার জন্মসনদ চাওয়া হইতেছে না। ফলে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সন্তান এবং পথশিশুদের জন্মনিবন্ধন করিতে যেই জটিলতা ছিল, আশা করা যায় তাহা আর থাকিবে না। ‘বেটার লেট দেন নেভার’ প্রবাদের আলোকে বলা যায়—ইহা সার্বিকভাবে অত্যন্ত স্বস্তির। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন রহিয়াছে ব্রিটিশ আমল হইতেই; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত উহার কার্যকারিতা ছিল খুবই নগণ্য। দেশের সকল মানুষকে জন্ম ও মৃতু্যনিবন্ধনের আওতায় আনিতে ২০০১ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় প্রকল্প শুরু হয়। তখন হাতে লিখা জন্ম ও মৃত্যুসনদ দেওয়া হইত। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়া সরকার তাহা বাধ্যতামূলক করিয়াছে। এই লক্ষ্যে সরকার জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ (সংশোধিত ২০১৩) প্রণয়ন করে। জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, শিশু অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করিতে আইনটি ৩ জুলাই ২০০৬ হইতে কার্যকর করা হয়। ২০১০ সাল হইতে অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জন্মনিবন্ধন ও মৃতু্যসনদ প্রদানের কার্যক্রম শুরু করা হয়; কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইহার পূর্বে করা হাতে লিখা সনদগুলি হালনাগাদ করা হয় নাই। সেই কারণে অনেকের দুর্ভোগ সুরাহা হইবার পরিবর্তে আরো বাড়িয়াছে। পূর্বে সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করিতে বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর প্রয়োজন হইলেও ২০২১ সালের শুরু হইতে নিয়মে পরিবর্তন আনিয়াছিল সরকার। তাহাতে বলা হইয়াছে, সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ করিতে বাবা-মায়েরও জন্মনিবন্ধন নম্বর লাগিবে। সন্তানের জন্মনিবন্ধনের কারণে বাবা-মায়েরা যাহাতে নিজেদের জন্মনিবন্ধন করিতে বাধ্য হন এবং ইহার মাধ্যমে যাহাতে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী জন্মনিবন্ধনের আওতায় আসে, সেই জন্য এই নিয়ম করা হইয়াছিল; কিন্তু ইহার জন্য বাবা-মায়েরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হইতেছিলেন।

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ এখনো অনলাইন কার্যক্রমের সহিত অভ্যস্ত নহে। কাগজ কোথায় সংযুক্ত করিতে হইবে, অনলাইন ফর্ম কীভাবে পূরণ করিতে হইবে—সেইগুলি তাহাদের নিকট বড় মাথাব্যথার। এত কিছুর পরও কষ্ট করিয়া ফর্ম জমা দেওয়ার পর যদি সেবাপ্রার্থীকে নানাবিধ দুর্ভোগ পোহাইতে হয়, তাহা হইলে তাহার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন লইবে না? মনে রাখিতে হইবে, এমন কোনো নিয়ম করা উচিত নহে, যাহা মানুষের জীবনকে সহজ করিবার পরিবর্তে কঠিন করিয়া দেয়।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন