শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শ্রীলঙ্কার বন্দরে চীনের ‘গুপ্তচর’ জাহাজ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ০০:২৭

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তির পরও শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে গতকাল মঙ্গলবার নোঙর করেছে চীনের একটি গবেষণা জাহাজ ইউয়ান ওয়াং-৫। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি শ্রীলঙ্কার জলসীমায় কোনো গবেষণা চালাবে না— এমন শর্তে আগামী ২২ আগস্ট পর্যন্ত ঐ বন্দরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইউয়ান ওয়াং-৫ চীনের সর্বাধুনিক স্পেস-ট্র্যাকিং জাহাজগুলোর একটি। এই জাহাজ থেকে স্যাটেলাইট, রকেট এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জাহাজ বিশ্লেষণ বিষয়ক ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি একটি গবেষণা এবং জরিপকাজ চালানোর জাহাজ। ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমের খবরে জাহাজটিকে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য গুপ্তচর জাহাজ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ কারণে ভারত আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল যে, শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার পথে এই চীনা জাহাজের ট্র্যাকিং সিস্টেমগুলো ভারতীয় স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারি চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও চীনের তৎপরতায় উদ্বেগ জানিয়েছিল। তবে চীন বলেছে, এই জাহাজ কোনো দেশের নিরাপত্তা স্বার্থকে প্রভাবিত করে না। তাই তৃতীয়পক্ষের এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না।

 শ্রীলঙ্কার তথ্যমন্ত্রী বন্দুলা গুণবর্ধনা

  • ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে চীনের জাহাজটির হাম্বানটোটা বন্দরে নোঙর করার কথা ছিল। কিন্তু ভারত সরকার এর বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার কাছে মৌখিক প্রতিবাদ জানায়। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনকে জাহাজটির নোঙরের সময় পিছিয়ে দিতে বলেছিল। তারা বলেছিল, এ বিষয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের এই পদক্ষেপের পর চীন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, তথাকথিত নিরাপত্তা উদ্বেগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কার ওপর কোনো কোনো দেশের চাপ দেওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক। তবে চীনা বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছিল, ইউয়ান ওয়াং জাহাজগুলো চীনা সেনাবাহিনীর ‘স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট ফোর্স’ দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তারপরও কলম্বো সরকার ঘোষণা করে যে, জাহাজটিকে হাম্বানটোটার দক্ষিণ বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হবে। শ্রীলঙ্কার তথ্যমন্ত্রী বন্দুলা গুণবর্ধনা সাংবাদিকদের বলেন, ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল এবং শ্রীলঙ্কা এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ নোঙরে দেরি করার জন্য অনুরোধ করেছিল। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে জাহাজ শ্রীলঙ্কায় এসেছে। আমরা এই জাহাজগুলোকে আসতে দিয়েছি। একইভাবে আমরা চীনা জাহাজকে নোঙরের অনুমতি দিয়েছি।

গত শনিবার শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সরকার বিষয়টি সমাধান করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করেছে। শ্রীলঙ্কার জলসীমায় কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হবে না এই শর্তে জাহাজটি নোঙরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের ‘গুপ্তচর’ জাহাজ

  • চীনের হুঁশিয়ারি

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেছেন, শ্রীলঙ্কার সক্রিয় সহযোগিতায় চীনা জাহাজটি সফলভাবে বন্দরে নোঙর করেছে। জাহাজটি সামুদ্রিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। যা আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সাধারণ অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই জাহাজ কোনো দেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত করে না। তাই তৃতীয় পক্ষের এতে হস্তক্ষেপ বা বাধা দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, অনুষ্ঠানে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের একজন প্রতিনিধি ছাড়াও দেশটিরও বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। গবেষণা জাহাজটির প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খাদ্য নেওয়ার জন্য সেখানে কিছুটা সময় লাগবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর অংশ হিসেবে চীন শ্রীলঙ্কাকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। তবে, এসব অর্থ যে শ্রীলঙ্কার জন্য সুফল বয়ে এনেছে তা বলা যাবে না। যেমন, হাম্বানটোটা বন্দরের নির্মাণ ব্যয়ের ঋণ মেটাতে শ্রীলঙ্কা অসমর্থ হওয়ার পর চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংস ২০১৭ সালে হাম্বানটোটা বন্দরের বেশির ভাগ শেয়ার কিনে বন্দরটির ৯৯-বছরের ইজারা লাভ করে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এশিয়া-ইউরোপ শিপিং রুটের কাছাকাছি এই বন্দরটিকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে চীন।

  • কূটনৈতিক চাপের মুখে শ্রীলঙ্কা!

বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত এবং চীন— এই দুটি দেশের মধ্য থেকে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্নে শ্রীলঙ্কাকে প্রতিবার কূটনৈতিক চাপের মধ্যে পড়তে হয়। এই জাহাজ নিয়েও এবার তার প্রতিফলন দেখা গেল। যদিও আর্থিক সংকটে জর্জরিত দেশটির এখন দুই দেশেরই সহায়তা দরকার। শ্রীলঙ্কার এক মন্ত্রী বলেছেন, বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে যাতে বিরোধ তৈরি না হয়— সেটা নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে।

জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর আগেই, ভারত শ্রীলঙ্কার বিমান বাহিনীকে সামুদ্রিক নজরদারির জন্য একটি ডর্নিয়ার ২২৮ বিমান দিয়েছে। একটি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে এটিকে তার দেশের নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী এবং ভারতের নৌবাহিনীর মধ্যে সামুদ্রিক নজরদারিতে সহযোগিতার সূচনা বলে অভিহিত করেছেন।

  • কী আছে এই জাহাজে?

আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, ইউয়ান ওয়াং-৫ জাহাজের ওজন ২৩ হাজার টন। এটি ওয়াং সিরিজের তৃতীয় প্রজন্মের নজরদারি জাহাজ। ২০০৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম এই জাহাজ সমুদ্রে নামে। জিয়াংনান শিপইয়ার্ড এই জাহাজটির নির্মাণকারী সংস্থা। যে কোনো উপগ্রহের উপরেও নজরদারি চালাতে পারে এই চীনা ‘গুপ্তচর’ জাহাজ। পাশাপাশি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তথ্য দিতেও সক্ষম এই জাহাজ। ৭৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ক গবেষণার তথ্য সহজেই সংগ্রহ করতে পারে জাহাজটি। এর অর্থ, ভারতের তামিলনাড়~র কালপাক্কাম, কুডানকুলামসহ ঐ এলাকায় থাকা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে পারে এই জাহাজ। কেরালা, তামিলনাড়~ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ছয়টি বন্দরের উপরেও চীন এই জাহাজের সাহায্যে নজরদারি চালাতে পারবে। এসব কারণেই শ্রীলঙ্কার বন্দরে চীনের এই জাহাজের উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তি ভারতের।

ইত্তেফাক/ইআ