নির্মাণকাজের নিরাপত্তায় অবহেলা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ০৩:৪০

নির্মাণকাজে নিরাপত্তায় অবহেলা প্রদর্শন ও জবাবদিহির অভাবে দেশে নানা দুর্ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে। সোমবার রাজধানীর উত্তরায় নির্মাণাধীন বিআরটি প্রকল্পের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বক্স গার্ডার প্রাইভেট কারের উপর পড়িয়া গিয়া একই পরিবারের দুই শিশুসহ নিহত হইয়াছেন পাঁচ জন। ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। ইহা আমাদের সম্মুখে বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা করিয়াছে। একই প্রকল্পে গত ১৫ জুলাই গাজীপুরে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের লঞ্চিং গার্ডার চাপায় একজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। গত বৎসর ১৪ মার্চ বিমানবন্দর এলাকায় একটি গার্ডার লঞ্চার ভাঙিয়া পড়িয়া তিন চীনা কর্মীসহ ছয় জন আহত হন। এইভাবে একটি প্রকল্পে বারংবার এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটিতেছে?

উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হইতে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে বিশেষ লেনের মাধ্যমে বাস চলাচলের জন্য বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলিতেছে। ২০১২ সালে এই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ইহা শেষ হইবার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদ ও অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হইলেও প্রকল্পটির নিরাপত্তায় কেন এই উদাসীনতা তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করিতেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি, গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি নামের একটি সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার। দেখা যায়, বিদেশি সাহায্য লইয়া এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হইলেও প্রকল্প এলাকার নিরাপত্তা যেন দেখিবার কেহ নাই। আমরা প্রায়শ লক্ষ করিয়া থাকি, অনেক প্রকল্প এলাকার প্রবেশমুখে ও বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ডে লিখা থাকে ‘সেফটি ফার্স্ট’ বা নিরাপত্তাই প্রথম। কিন্তু আমাদের মনে হয় না, কথাটির মর্ম বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন। বরং নিন্দুকেরা রসিকতা করিয়া বলিয়া থাকেন নিরাপত্তা নহে, ‘চুরিই প্রথম’। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প হইতে হরিলুটের চিন্তায় বিভোর থাকেন অনেকে। ফলে ‘নিরাপত্তা প্রথম’ কথাটা ম্লান ও গুরুত্বহীন হইয়া পড়ে। এই কথাটা যেন শুধু কথার কথা না থাকে, সেইদিকে এখন আমাদের যথাযথভাবে নজর দেওয়ার সময় আসিয়াছে।

আমরা দেখিলাম, উত্তরার মর্মান্তিক ঘটনার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ছুটিয়া গেলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষ্য অনুযায়ী ‘আমি তোমাদেরই লোক’ এই কথা প্রমাণ করিতে রাজনীতিবিদগণ মানুষের বিপদে-আপদে পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইবেন ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠে, তাহা হইলে এতদিন তাহারা কী করিলেন? অবশ্য ইহার জন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তাই প্রধানত দায়ী। এখানে এমন দুর্বল ক্রেন কেন ব্যবহার করা হইল? প্রকল্প এলাকা ঘেরাও না করিয়া অরক্ষিত রাখা হইয়াছে কেন? এমন বহু প্রশ্ন উঠিয়াছে উত্তরার সেই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া। বিভিন্ন প্রকল্পের তরফ হইতে অভিজ্ঞতার জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা বিদেশ গমন করিয়া থাকেন। তাহারা সেইখান হইতে যেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাহার বাস্তবায়নের নজির কি এই নিরাপত্তাহীনতা?

উত্তরার দুর্ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দুঃখ প্রকাশ করিতে হইয়াছে। কিন্তু এইভাবে সকল কিছুর জন্য দেশের প্রধান নির্বাহীকে দুঃখ প্রকাশ করিতে হইবে কেন? সরকারি কর্মকর্তাদের বড় ধরনের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি হালকা করিয়া দেখিলে চলিবে না। এখন বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে উন্নত দেশের মতো গাড়ি-বাড়িসহ উন্নত জীবনযাপন ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তাই তাহাদের কাজেকর্মে দায়িত্বশীলতা একান্ত কাম্য। ইহার আগে ২০১২ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভারের গার্ডার ভাঙিয়া ২৯ জন নিহত হয়। তাহা এখনো বিচারাধীন। গত সোমবার একই দিন গুলিস্তানে নির্মাণাধীন ভবন হইতে লোহার রড পড়িয়া কয়েক জন আহত হইয়াছেন। অতএব, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করিতে হইবে। গার্ডার, রড, সিমেন্ট, ইট প্রভৃতি পড়িয়া পথচারী ও যাত্রীবাহী মানুষ যাহাতে আর হতাহত না হন, এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চুক্তির শর্ত এবং আইন ও বিধিমালা অবশ্যই মানিয়া চলিতে বাধ্য করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন