সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ’

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২২, ০৩:২৯

মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত—সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু কিছু মানুষ কখনো এমন কিছু অমানবিক কাজ করিয়া বসে—যাহা তাহার মনুষ্যত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলিয়া দেয়। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রতিযোগিতার যুগে মানুষ বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হইয়া পড়িয়াছে। দেখা যাইতেছে, আমরা যেই সমাজে বাস করিতেছি সেইখানে মানুষে মানুষে বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সৌহার্দ-সম্প্রীতি যেন অভিধানের ভিতরেই আবদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। সম্পত্তি লইয়া পিতা কিংবা মাতা অথবা দুলাভাইকে হত্যা করিবার সম্প্রতি বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। এই সকল সংবাদ আমাদের বুঝাইয়া দেয়—মানুষ তাহার মনুষ্যত্বের বোধ বহুক্ষেত্রেই বর্গা দিয়াছে স্বার্থের বলিকাষ্ঠে। 

গত মঙ্গলবার বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে পারিবারিক জমি লইয়া বিরোধকে কেন্দ্র করিয়া শ্যালকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে দুলাভাই নিহত হইয়াছেন। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, পিতার জমি বিক্রয়ের ৩১ লক্ষ টাকা ছিনতাই করিতে ছিনতাইকারী ভাড়া করিয়া সেই অর্থ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়াছে রাজধানীর মানিকদী এলাকায়। জয়নাল মিয়া তাহার বসতভিটার জমি বিক্রি করিয়া সেই টাকা ব্যাগে লইয়া রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরিবার সময় তাহাকে তাহার দুই ছেলে লোহার রড দিয়া আঘাত করিয়া ফেলিয়া দেন এবং তাহার ৩১ লক্ষ টাকা লুটিয়া নেন। তাহারা তাহাদের বৃদ্ধ মাকেও বেধড়কভাবে পিটান। কিছুদিন পূর্বে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে কুড়াল দিয়া কুপাইয়া পুত্রের বিরুদ্ধে পিতাকে হত্যার অভিযোগ উঠিয়াছে। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের পটিয়ায় সম্পত্তির জন্য মাকে গুলি করিয়া হত্যার অভিযোগ উঠিয়াছে তাহারই নিজ পুত্রসন্তানের বিরুদ্ধে।

প্রকাশিত সংবাদসমূহের বাহিরে দেশের শতসহস্র গৃহকোণে বৃদ্ধ বাবা-মাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা রহিয়াছে, যাহার খুব সামান্য অংশই চার দেওয়ালের বাহিরে আসিতে পারে। যিনি তাহার পিতা-মাতাকে ‘বোঝা’ মনে করিতেছেন, তিনিও তো একদিন বৃদ্ধ হইবেন! স্কুলের পাঠ্যবইতে এখনো ভাবসম্প্রসারণ হিসাবে পড়ানো হয়—দাঁত থাকিতে মানুষ দাঁতের মর্ম বুঝে না। এই ভাবটি সম্প্রসারণে অবধারিতভাবে চলিয়া আসে পিতা-মাতার কথা। অর্থাৎ মানুষ বহু ক্ষেত্রেই পিতা-মাতা বাঁচিয়া থাকিতে তাহাদের মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করিতে পারেন না। নূতন যুগ, নূতন জীবন; মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। ইহার সহিত রহিয়াছে পারিপার্শ্বিক শিক্ষা। সেই কারণে পত্রপত্রিকা খুলিলেই দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তথা ‘মাতা-পিতা’র ওপর নির্যাতন চলিতেছে বিবিধ পন্থায়। নিশ্চয়ই আমাদের সমাজে এখনো ভালো সন্তানের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশও যদি কুপুত্র থাকে, তবে মোট বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধকোটি পিতা-মাতা প্রতিনিয়ত বিবিধ নির্যাতনের শিকার হইতেছেন। সংখ্যাটি কিন্তু বিপুল! এই জন্য ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণের আইন করা হয়। এই আইনটিই সভ্য সমাজে লজ্জার প্রতীকও বটে। কারণ, যাহাদের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর আলো-বাতাস পাইলাম, তাহাদের কিনা বৃদ্ধ বয়সে ভরণপোষণের জন্য আইন দ্বারা বেষ্টনী দিতে হইবে! এই ধরনের কুসন্তানদের জন্যই ‘সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না’ বিধায় ‘আঙুল বাঁকা করিয়া’ এই আইন তৈরি করিতে হইয়াছে বটে। কিন্তু দুঃখের সহিত বলিতে হয়, আইন আছে কি নাই, তাহা জানেনই না বেশির ভাগ বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা নির্যাতনকারী সন্তান। এই কারণে আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাইতেছে অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের নিকট হইতে ভরণপোষণ পাইতেছেন না; বঞ্চনার শিকার হইতেছেন।

নির্যাতনকারী সন্তানেরা কি জানেন না—মহান সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কোরআন শরিফ ও হাদিসে বারংবার তাহার ইবাদতের পরই বাবা-মায়ের খেদমতের কথা বলিয়াছেন এবং বাবা-মায়ের খেদমত করাকে ফরজে আইন বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন! হিন্দুধর্মের মনুসংহিতায়ও বলা হইয়াছে—সন্তানের জন্য পিতামাতা যেই ক্লেশ সহ্য করেন পুত্রপুত্রী শত শত বৎসরে, শত শত জন্মেও সেই ঋণ পরিশোধ করিতে সমর্থ্য নহে।

ভূপেন হাজারিকার একটি গানের লাইনে বলা হইয়াছে—‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ, দানব কখনো হয় না মানুষ। যদি দানব কখনো-বা হয় মানুষ, লজ্জা কি তুমি পাবে না?’ আসলে এই সকল মানুষরূপী অমানুষদের লজ্জা বলিয়া কিছু নাই।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন