শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ডলারের দাপটে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২, ০৪:৩০

মার্কিন ডলারের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকে একধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বলা যায়, ডলারের দাপট আর্থিক ব্যবস্হায় এমন এক ‘ফুটো’ সৃষ্টি করছে, যার ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। ডলারের বিপরীতে নিজেদের মুদ্রা টিকিয়ে রাখতে এসব দেশের নীতিনির্ধারকেরা সমষ্টিগতভাবে প্রতি সপ্তাহে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবহার করছেন। গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য জমিয়ে রাখা এই ‘জরুরি তহবিল’ তথা রিজার্ভ থেকে চলতি বছর দেশগুলো খরচ করেছে মোট ৩৭৯ বিলিয়ন ডলার।

বিপুল রিজার্ভ খরচের এই চিত্র থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে, ডলারের উচ্চমূল্য কতটা শক্তিশালী আকার ধারণ করেছে এবং একই সঙ্গে আন্দাজ করা যায়, বর্তমান মুহূর্ত কতটা বিপজ্জনক। তবে দুঃখজনক হলো, ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটের (বিদেশি বিনিময় বাজার) স্হিতিশীলতার প্রশ্নে নানামুখী প্রচেষ্টার পরও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো বিপর্যয় এড়াতে পারছে না।

ঘানা, পাকিস্তান কিংবা চিলি—প্রতিটি দেশের মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকট আকার ধারণ করেছে দারিদ্র্য। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা মহামারির ধাক্কায় অর্থনৈতিক অস্হিরতা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এসবের অভিঘাতে চলতি বছর বিশ্বব্যাপী ৩৬টি মুদ্রা তাদের ১০ শতাংশ ‘মূল্যমান’ হারিয়েছে। এমনকি এই ৩৬টি মুদ্রার মধ্যে শ্রীলঙ্কার রুপি ও আর্জেন্টিনার পেসোসহ ১০টি মুদ্রার মান ২০ শতাংশেরও বেশি নিচে নেমে গেছে।

এই চিত্রের সঙ্গে বিগত অর্ধশতাব্দীর গ্রেট এমার্জিং মার্কেট (বৃহত্ উদীয়মান বাজার) সংকটের একটি নির্দিষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে—১৯৮০-এর দশকে লাতিন আমেরিকায় ঋণের পতন ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এক দশক পরে এর ঢেউ আছড়ে পড়ে এশিয়ায়। আজকের দিনে অধিকাংশ বিশ্লেষক এ ধরনের চরম বিপর্যয়কে অসম্ভাব্য হিসেবে দেখে থাকেন যদিও। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এ-ও বলেন, ডলারের ঊর্ধ্বগতির প্রধান চালক তথা ফেডারেল রিজার্ভকে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্হা) মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অনেক কিছু করতে হবে। আরো আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। এবং এক্ষেত্রে যেটি ঘটবে, লক্ষ্য অর্জনের জন্য ফেডারেল রিজার্ভ যত বেশি মার্কিন সুদের হার বাড়াবে, তত বেশি ঝুঁকিতে পড়বে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। এসব দেশ চরম মুদ্রাসংকটে পড়বে। মুদ্রাসংকটে ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ভুববে ব্যাপক ঋণসংকটে।

সিডনির স্যাক্সো ক্যাপিটাল মার্কেটসের কৌশলবিদ জেসিকা আমির বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই, আমরা উদীয়মান বাজারে (এমার্জিং মার্কেট) সত্যিকার অর্থে সংকটে পড়তে চলেছি।’ জেসিকা যোগ করেন, ‘ইতিমধ্যে বাজে অবস্হা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য বড় অনিশ্চয়তা হলো ডলারের দাপট তথা শক্তিশালী ডলার।’

মনে রাখতে হবে, কেবল উদীয়মান অর্থনীতির দেশই ডলারের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। ইউরোপীয়ান দেশগুলো এবং জাপানিদের দিকে তাকালেও এর উত্তর পাওয়া যাবে। গেল মাসে প্রথমবারের মতো গ্রিনব্যাকের (ডলার) সঙ্গে মূল্যমানের তুলনামূলক বিচারে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে ইউরো, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ১৯৯৮ সালের পর থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্হায় পতিত হয়েছে ইয়েন (জাপানের মুদ্রা)। মূলত বিদেশ থেকে ভোক্তা বা কোম্পানির পণ্য বা সেবা আনতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কিংবা ডলারের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সরকার শক্তিশালী ডলার দাপটে অস্তিত্বহীনতার সম্মুখীন হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুসারে, এ বছর ৬৫টি উন্নয়নশীল দেশের ছয় ভাগের বেশি দেশের রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরাও একই কথা বলছেন। আশ্চর্যজনকভাবে চীনের মুদ্রার অবমূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের পর দেশটি মুদ্রার দ্রুততম দরপতন দেখেছে। ঘানা, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক ও বুলগেরিয়ায় রিজার্ভের সবচেয়ে বড় পতন ঘটছে এখন। এছাড়া এসব দেশের অনেক জায়গায় সবচেয়ে বাজেভাবে কারেন্সি সেল অফ (মুদ্রার বিক্রয় বন্ধ হয়ে যাওয়া) দেখা যাচ্ছে।

ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের মানি ম্যানেজার পল গ্রির বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী তারল্য বৃদ্ধি, নিম্নমুখী উত্পাদন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শক্তিশালী মার্কিন ডলারের দাপটে এটি অনুমান করা যুক্তিসংগত হবে যে, ম্যাক্রো সমস্যা প্রকট হওয়ার পাশাপাশি উদীয়মান বাজার অর্থনীতির দেশগুলো ক্রমাগত মুদ্রার চাপের মুখোমুখি হবে।’ এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘আমরা সতর্ক।’

কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছ থেকে বেলআউট চেয়েছে ঘানা। সেডিকে (ঘানার স্ট্যান্ডার্ড মনিটারি ইউনিট) রক্ষা করতে ডলার বিক্রি করছে দেশটি। যদিও এই প্রক্রিয়ায় রিজার্ভের প্রতি ১০ ডলারের মধ্যে ২.৬০ ডলার হারাচ্ছে দেশটি। এভাবে এ বছর দেশটির মুদ্রা এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। ইউক্রেন, পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়া তাদের রিজার্ভের প্রায় ৩০ শতাংশ হারিয়েছে এভাবে।

মুশকিল অনুভব করছে বড় দেশগুলোও। চিলির রিজার্ভ বছরের প্রথমার্ধে ১০ শতাংশেরও বেশি পড়ে যায়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দেশটির রিজার্ভ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। কারণ চিলি ডলার বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। পেসোকে দামের রেকর্ড পরিমাণ নিম্নমুখিতা থেকে তুলে আনতে এমনটি করতে বাধ্য হয় দেশটি। তুরস্কে লিরার দাম পড়ে গেছে ২৬ শতাংশ। এজন্য বিলিয়ন বিলিয়ন মুদ্রা হারিয়েছে দেশটি। এই পতন ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে বিগত ৯-১০ বছর ধরে।

ফেডের (ফেডারেল রিজার্ভ) বেশির ভাগ কড়াকড়ি ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি। এই অবস্হায় ডলার নিঃশেষ করার ঝুঁকিতে রয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগ্গিরই তাদের রিজার্ভ তলানিতে ঠেকবে। বাজারে এই ধারণা বাড়ছে যে, দেশগুলোতে ডলার ফুরিয়ে যাচ্ছে; যার ফলে দেশগুলোর মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পড়ছে। এর ফলে দুর্বল দেশগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে ছিটকে পড়তে পারে। আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি সেই সমস্যাটিকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এমন পরিস্হিতিতে মদ্রাস্ফীতির শীর্ষে আরোহণ করতে পারে দেশগুলো। এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যভাবে জন-অসন্েতাষ দেখা দিতে পারে—যেমনটি বলছে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা।

এইচএসবিসির বৈদেশিক বিনিময় গবেষণার বৈশ্বিক প্রধান পল ম্যাকেল বলেছেন, ‘বেশ কিছু উদীয়মান বাজারের মুদ্রা উল্লেখযোগ্যভাবে ‘অবচয় চাপের’ সম্মুখীন হচ্ছে। আমি মনে করি না যে, একটি বিস্তৃত মুদ্রার সংকট বিকশিত হচ্ছে। যা হোক, কেউ কেউ ব্যাপক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলের দেশগুলো।’

এই পথ যত বড়ই হোক না কেন, অতীতের সিস্টেমিক শকগুলোর সঙ্গে এর কিছু কিছু মিল রয়েছে। ১৯৯৭ সালের এশিয়ান আর্থিক সংকট এবং ১৯৮০-র দশকের লাতিন আমেরিকার ‘হারানো দশক’— উভয়ই অত্যধিক বাহ্যিক ঋণ গ্রহণের সময়কালের উপযুক্ত উদাহরণ। তারপর ফেডের সুদের হার বাড়তে শুরু করলে হঠাত্ পুঁজির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এখন। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এক দশক ধরে সস্তা তহবিল নিয়ে এখন ডলারের ঘাটতি মোকাবিলা করছে।

উদীয়মান বাজারে পুঁজির প্রবাহ এ বছর মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। ব্লুমবার্গের একটি জরিপমতে, বিনিময় হারের অস্হিরতা গত বছরের তুলনায় এক-তৃৃতীয়াংশ বেড়েছে। জে পি মর্গ্যান চেজ অ্যান্ড কোং ডেটার মতে, ডলার ধার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উচ্চফলনশীল সম্পদে বিনিয়োগকারী টানা তৃতীয় বছরের মতো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে ভালো মূলধনযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দেশগুলোর মুদ্রা বেছে বেছে কেনার জন্য যথেষ্ট প্রণোদনা নেই ব্যবসায়ীদের জন্য। এর কারণ, বছরের সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও এই বিনিময় হার ইতিহাসে অতিমূল্যায়িত রয়ে গেছে। এমএসসিআই উদীয়মান বাজার মুদ্রা সূচক এখনো তার ২৫ বছরের ইতিহাসে ৯২ শতাংশ বাণিজ্য করছে। বিপরীতে উদীয়মান বাজারের স্টকগুলো তাদের সক্ষমতার ৬৮ শতাংশ বাণিজ্য করছে। যখন ব্যবসায়ীরা ঝুঁকির কথা বলেন, তখন তারা আরো আকর্ষণীয় প্রস্তাব তোলেন।

লেখকদ্বয়: সাংবাদিক

ব্লুমবার্গ থেকে ভাষান্তর :সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন