শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজনীতির টালিখাতা 

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২, ০৫:৩০

বঙ্গবন্ধু তো শুধু আওয়ামী লীগের ছিলেন না, তিনি ছিলেন গোটা বাঙালির নেতা। বাঙালির মুক্তির দূত। এটা প্রমাণিত সত্য হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ব্যতীত স্বাধীনতা পক্ষশক্তির দাবিদার কিছু দল কেন ১৫ই আগস্টকে শোক দিবস হিসেবে গ্রহণ করে না? এ প্রশ্নের সমাধান হওয়া খুবই জরুরি।

এমন প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পূর্বদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয়ের পতাকা ওড়ে বাংলাদেশে। স্বজন হারানোর বেদনা উপেক্ষা করে শামিল হয় আনন্দের ঢেউয়ে। পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের চেহারা জ্বলজ্বল করছে। দলমত নির্বিশেষে সমন্বিত দৃষ্টিতে, সমন্বিত কণ্ঠে গান তোলে—‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। আনন্দ অশ্রুতে ভিজে যায় বাংলার জমিন। স্বাধীনতার প্রিয় নাম ‘শেখ মুজিব’। যে নামের জাদুতে দেশটি স্বাধীন হয়, অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়—এ অসম্ভব সম্ভব হয় কীভাবে? সে প্রশ্নও জাতির সামনে ঘুরঘুর করছে দীর্ঘদিন ধরে। বলার অপেক্ষা না যে, সদ্য স্বাধীন দেশের অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল যুদ্ধের কারণে। যুদ্ধবিধ্বস্ত যে কোনো দেশের অবস্হা এমনটিই হয়। কিন্তু বাঙালির মনে এতটুকু দুঃখবোধ ছিল না। কারণ বাঙালির প্রিয় নেতা শেখ মুজিব স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছেন। বাঙালি ঘুরে দাঁড়াবেই—এই স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হলেও প্রশাসনে এক বিরাট জঞ্জাল সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানি কারাগারে। 

আন্তর্জাতিক চাপে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ স্বদেশের মাটিতে ফেরেন। অর্থাত্ বিজয়ের ২৩ দিন পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেন বীরবেশে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্হিতিতে প্রশাসন চলছিল তার নামেই। কিন্তু রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রশাসনে এক ভয়ংকর বিভাজন সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমে লন্ডনে যান। দুশ্চিন্তা ও ক্লান্িত মোচনে তিনি লন্ডনে কয়েক দিন বিশ্রামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন মুক্ত বাতাসে। মধ্য লন্ডনের বিলাসবহুল সুট হোটেল ক্যারিজেসে ওঠেন তিনি। ১১২ নম্বরের এই সুটটি যেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে ফোন আসে তার কাছে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। শেখ মুজিবের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তিনি যদি দ্রুত ঢাকায় না পৌঁছান তবে নবগঠিত সরকার দ্বিধাবিভক্তি হয়ে পড়বে। নতুন দেশে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এ অবস্হায় গৌরবময় স্বাধীনতা আন্দোলনের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। শেখ মুজিব পুরো বিষয় আঁচ করতে পেরে প্রিয় দেশের প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসতে পুনঃসিদ্ধান্ত নেন ক্লান্িত ভুলে গিয়ে। দেশের মাটিতে পা রাখামাত্র লাখ লাখ জনতা প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানায়। বাঙালি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। স্বাধীনতা যেন পূর্ণ হলো। 

এদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে বহিঃশক্তির প্রভাবে কোনো কোনো মন্ত্রী নষ্ট পথের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ‘বঙ্গবন্ধু, ফিরে এসে দেখেন তার সিংহাসনটি ফাঁকা থাকলেও প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক গদিচু্যত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদই মোশতাক আহমদকে সরিয়েছেন। কারণ, মোশতাক আহমদ স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় আমেরিকার সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। মোশতাকের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা করার। এদিকে ১৫ই জুলাই ১৯৭১ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হেনরি কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সফরের আয়োজন করেছিলেন চীনে। বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খন্দকার মোশতাক ঐ সফরে খুবই আগ্রহী ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাত্ করার একটা চক্রান্ত চলছিল। সে চক্রান্েতর সঙ্গে মোশতাক জড়িত ছিল। মোশতাকের রাষ্ট্রবিরোধী এ চক্রান্ত ভুলে যাওয়ার না হলেও বঙ্গবন্ধু তাকে বিশ্বাস করে মন্ত্রিপরিষদে ফিরিয়ে আনেন। 

১৯৭৫, ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সময় খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্র ছিল সুদূরপ্রসারী। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি সংবিধান তৈরির কাজে হাত দেন। সংবিধানের মহত্ আদর্শগুলো সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে নানা সংকটের মধ্যে পড়েন তিনি। পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বিশ্বাসী সেনা কর্মকর্তা ও সিভিল প্রশাসন গড়ে তুলতে বাধ্য হন। যারা শেখ মুজিবকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। কিন্তু শেখ মুজিবের একান্ত আস্হাভাজনের অভিনয় করে মুজিব পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন তারা এবং নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু এসব সুবিধাবাদ রাজ কর্মচারী ও সুবিধাবাদ রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ড সামাল দিতে গিয়ে দেশের পর্বতসম সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হতে পারছিলেন না। উল্লেখ্য, পাকিস্তানি হায়েনাদের হিংস্র থাবায় বাংলাদেশটা বধ্যভূমি ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। খাদ্যদ্রব্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের অভাব তীব্র হয়ে উঠেছিল। দোকানপাটও তেমন ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পাটশিল্প, চা-শিল্পও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এদিকে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী ১ কোটি শরণার্থী আনন্দচিত্তে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসে। এমনি পরিস্হিতিতে খাদ্যসংকট মোকাবিলা জরুরি হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আন্তর্জাতিক রিলিফ সামগ্রী আসতে থাকে। কিন্তু ভাঙা রাস্তাঘাট ও পর্যাপ্ত নৌযানের অভাবে রিলিফ সামগ্রী দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। দেশে ভয়ংকর অবস্হা তৈরি হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে অজনপ্রিয় করতে প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারী লুটপাটতন্ত্র কায়েম করে ফেলে। দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের বিশ্বাস ছিল প্রবল। কতিপয় রাজনৈতিক দল দেশে বিশৃঙ্খলা পরিবেশ তৈরি করে। এমনি পরিস্হিতিতে দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। তিনি সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বাকশাল গঠন করেন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্র‚য়ারি পরিস্হিতি সামাল দেওয়ার জন্য সামরিকভাবে বাকশাল গঠন করেছিলেন। একটি মহত্ উদ্দেশ্য নিয়ে বাকশাল গঠন করলেও নিন্দুকরা এর সমালোচনা করতে শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে প্রলয়ংকরী বন্যায় দেশের অবস্হা কঠিন হয়ে পড়লেও তা সামাল দিতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সালে দেশ অনেকটাই শান্ত হয়ে ওঠে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারে, বঙ্গবন্ধু দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হবেন না। বঙ্গবন্ধু সফল হলে শত্রুরা ব্যর্থ হবে।

১৯৭৫-এর আগস্টের শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর মধ্যে একটা অস্হিরতা লক্ষ করা যায়। তিনি স্বভাবসুলভ যতটা খুশি থাকবার চেষ্টা করতেন মনের দিক থেকে ততটা খুশি ছিলেন না প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে। মাঝেমধ্যে তিনি হুংকার দিয়ে উঠতেন। বঙ্গবন্ধুর সারাটা জীবন কেটেছে মাঠে ময়দানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে। প্রশাসকের আবরণটা যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার ডাকে চরম আত্মত্যাগ এবং দেশাত্মবোধের প্রমাণ দেখিয়েছিল বাঙালি জাতি। নতুন প্রত্যাশায় নবজীবনে পা রাখা বাঙালির ভাগ্যে এমন কিছু ঘটবে, তা কখনো ধারণায় ছিল না। বঙ্গবন্ধু যখন অন্ধকার থেকে আলোতে আবিভূ‌র্ত হলেন, কিন্তু বিদ্রোহের বীজ যে পূর্ব থেকেই রোপিত হয়ে আছে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তছনছ করে দেয় বাঙালির স্বাধীনতাকে। মোশতাক রাষ্ট্রপতি হন। মাত্র হাতে গোনা ৮১ দিনের মাথায় ক্ষমতাচু্যত হন মোশতাক। ৭ই নভেম্বর তথাকথিত সিপাহি বিপ্লবের নামে জেনারেল জিয়া ক্ষমতার শীর্ষে দৃশ্যমান হন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়া কৌশলী ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। তার ভূমিকায় দেশের অনিষ্ট সাধন হয়। প্রচার করা হয় জাতির ক্রান্িতকালে জিয়া এগিয়ে আসেন দেশের কল্যাণে। আসল সত্য তা নয়।

শেক্সপিয়র বলেছেন, ‘মানুষ যে অনষ্টি সাধন করে, তা তাদের মৃতু্যর পরও বেঁচে থাকে। সাধিত মঙ্গল প্রায়শই তাদের অস্হিমজ্জার সঙ্গেই কবরস্হ হয়ে যায়।’ জিয়ার বেলায় তা-ই হয়েছে। ওপরে বিদ্রোহ বীজের যে কথা উল্লেখ করেছি দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিদ্রোহ বীজের গাছগুলো আজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে কিন্তু স্বাধীন দেশের স্হপতি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে না। যে দেশে জাতির পিতাকে অবমূল্যায়ন করা হয়, সে দেশের গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বেই, বাংলাদেশে যা হচ্ছে। ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। কিন্তু এ দেশের একটি বৃহত্ রাজনৈতিক দল এই শোক দিবসকে কটাক্ষ করে রাজনীতির মাঠে দাপিয়ে বেড়ায় কোন সাহসে? যারা বঙ্গবন্ধুকে মানে না, তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এদের স্বাধীন দেশে রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে না। রাজনীতি করতে হলে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করেই রাজনীতি করা উচিত। গণতন্ত্র বিকাশে সরকারের দুষ্কর্মের সমালোচনা করতেই হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর নোংরা রাজনীতি নয়। আওয়ামী লীগকেই এটা ভাবতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন