বিশ্বে এমন কোনো দেশ নাই, যেইখানে দুর্নীতির চর্চা নাই। পার্থক্য এই যে কম আর বেশি। পৃথিবীতে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন অর্থের দুর্নীতি চলিতেছে। এই দুর্নীতির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই চাপে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমজনতা তাহা উপলব্ধি করিতে পারে না। তাহারা দেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারটি অনেক সময় খালি চোখে দেখিয়া থাকে। এই সকল দেখিয়া তাহারা ভাবিতে পারে যে, দেশে কোনো দুর্নীতি নাই। কেননা সিস্টেম লস, অনিয়ম, অদক্ষতা, অবহেলা, অব্যবস্থাপনাসহ নানাভাবে যেই দুর্নীতি হইতেছে, তাহা আবার সরকারই পরিশোধ করিতেছে। ভ্যাট-ট্যাক্স ও জরুরি সেবামূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে সরকার সেই টাকাটা জনগণের নিকট হইতে তুলিয়া লইতেছে। এইভাবে জনগণের অজান্তেই দুর্নীতির টাকা বাবদ জনগণেরই পকেট কাটা যাইতেছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের করদাতাদের মধ্যে এই ব্যাপারে কোনো সচেতনতা বা ভাবান্তর নাই। লুঙ্গিপরা, ছিঁড়া কাপড় পরা, ভুখা-নাঙা অর্থাৎ নিত্যন্ত গরিব মানুষও কোনো না কোনোভাবে সেই টাকা পরিশোধ করিতেছে।
দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতির জন্য সরকারকে সর্বদা দায়ী করে কিছু বিরোধী রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রমুখ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাহারা তো দুর্নীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে না। বরং দুর্নীতি লইয়া স্টাডি করিয়া বা আন্দোলন করিয়া কোনো না কোনোভাবে লাভবান হইতেছে। ইহাতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে আমজনতা। প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্ব যাহাই বলি না কেন, সর্বত্র এ কথাই প্রযোজ্য। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে আমজনতাকে নির্লিপ্ত থাকিতে দেখা যায়। যেমন—কোনো একটি গ্রামে রাস্তা নির্মাণের সময় প্রায়শই খবর প্রকাশিত হয় যে, কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া নেওয়া হইয়াছে। ইহার পর কাজ শেষ না করিয়া সেই রাস্তা পড়িয়া থাকে বত্সরের পর বত্সর। এইভাবে বিভিন্ন প্রজেক্টে পুকুর চুরির খবর আমাদের অজানা নহে। ‘সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল’ প্রবাদ বাক্যের মতো নানাভাবে সরকারি অর্থ নয়ছয় ও অপব্যয়-অপচয় করা হয়। ইহাতে ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার এমনকি জনপ্রতিনিধি হইতে শুরু করিয়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি কি ক্ষতিগ্রস্ত হন? মোটেও নহে। বরং তাহারা যোগসাজশ করিয়া জনগণের ট্যাক্সের অর্থ মারিয়া দেন। বিদেশি ঋণে কোনো প্রকল্প পরিচালিত হইলেও শেষ পর্যন্ত সেই ঋণ পরিশোধের দায় চাপে জনগণের ঘাড়ে। এই যে দুর্নীতির কারণে একটি নির্দিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষ উন্নয়ন হইতে বঞ্চিত হইল, তাহাদের পকেট কাটা হইল, কিন্তু ইহাতেও দেখা যায় তাহারা নির্লিপ্ত! চোখের সম্মুখে অনিয়ম হইতে দেখিয়াও তাহারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো বাদ-প্রতিবাদ করে না।
অবশ্য উন্নত দেশের ক্ষেত্রে ইহা ব্যতিক্রম। সেখানকার জনগণের প্রধান পরিচয় হইল তাহারা ‘ট্যাক্সপেয়ার’। তাহাদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমীহ করিয়া চলেন। জনগণের এই উন্নত গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও সচেতনতার কারণে সেইখানে তুলনামূলকভাবে দুর্নীতি ও অনিয়ম কম। কেননা সেখানে সকল কিছুর জন্য প্রশ্ন তোলা মাত্র কৈফিয়ত দিতে হয়। কিন্তু গরিব ও অনুন্নত দেশের মানুষ উলটা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তোয়াজ করিয়া থাকে। তাহারা ডাইরেক্ট-ইনডাইরেক্ট নানা প্রকার ট্যাক্সের মাধ্যমে সরকারকে অর্থ জোগাইয়া থাকে বটে, কিন্তু সেই অর্থের জবাবদিহিতা চাহিবার ব্যাপারে তাহারা বেখেয়াল, উদাসীন। যত দিন এই সকল দেশের ট্যাক্সপেয়াররা সচেতন ও সজাগ না হইবে, তত দিন এই সকল দেশে দুর্নীতি বন্ধ হইবে না। তাহাদের ভাগ্যোন্নয়নও হইবে না কখনো। এই জন্য গণতান্ত্রিক দেশে শেষ বিচারে জনগণকেই দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে হয়। জনপ্রতিনিধিকে দেওয়া মানপত্র অনুযায়ী যেই সকল উন্নয়নের দাবি তোলা হয় এবং ইশতেহার মোতাবেক যেই সকল উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাহা কড়ায়গন্ডায় আদায় করিতে জানিতে হয়।
