অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৯২১ সালের দিকে ঢাকায় বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যে ভাবান্দোলন দেখা দিয়েছিল তার ঐতিহাসিক তাত্পর্য, সে সময় থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে কলকাতায় ডিরোজারিও এবং তার শিষ্যরা যে র্যাডিক্যাল আন্দোলন প্রবর্তন করেছিলেন তার সঙ্গে তুলনীয়। এই সাহসী ভাবুকেরা স্পষ্ট করেই ঘোষণা করেছিলেন—আমরা শুধু মুসলমান বা বাঙালি নই, আমরা মানুষ আর মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশের জন্য চাই জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং চর্চার ভেতর দিয়ে চিত্তের বিকাশ ও প্রকাশ।
বিশের দশকে এই ভাবান্দোলন শুরু হওয়া এবং ঢাকার বাঙালি মুসলিম জগতে আধুনিকতার প্রবেশ ঘটার অন্যতম প্রধান কারণ ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এই ভাবুকেরা সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র ও শিক্ষক। এদের মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহের হোসেন, আবদুল কাদির প্রমুখের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের ইউনিয়ন কক্ষে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠা ঘটে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামাঙ্কিত সংগঠনের। নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকলেও এটি ছিল সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ। এর প্রাণপুরুষ ছিলেন আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন। সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্রের নাম ছিল ‘শিখা’। ৮ এপ্রিল, ১৯২৭ খ্িরষ্টাব্দ। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস। প্রকাশিত হয় শিখার বার্ষিক পত্রিকার প্রথম সংস্করণ। পত্রিকার প্রথমে বড় করে লেখা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র। সম্পাদকের নাম অধ্যাপক আবুল হুসেন এমএ বিএল। পত্রিকার মুখবাণীতে লেখা—‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ প্রচ্ছদে মুসলমানদের প্রাণের গ্রম্হ একটি খোলা কোরআন শরিফের ছবি। যেন কোরআন শরিফ একটি আলো হয়ে আছে, যাকে আঁকড়ে শানিত হবে চিন্তার তরবারি।
সম্পাদকীয়তে অধ্যাপক আবুল হুসেন লিখলেন, ‘যে জাতির সাহিত্য নাই তাহার প্রাণ নাই। আবার যে জাতির প্রাণের অভাব সে জাতির ভেতর সত্যিকার সাহিত্য জন্মলাভ করতে পারে না। এ কথাটি ভালো করে বুঝবার মতো শক্তি বোধহয় বাঙালি মুসলমানের এখনো হয় নাই।...’ শিখার প্রথম সংখ্যা ঢাকার তত্কালীন বিদ্বত্সমাজকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য সমস্যা’, কাজী মোতাহের হোসেনের ‘সংগীত চর্চায় মুসলমান’, অধ্যাপক আব্দুর রসীদের ‘আমাদের নবজাগরণ ও শরীয়ত’ প্রবন্ধগুলো অনেক প্রগতিশীল লেখকের চিন্তার খোরাক হয়ে ওঠে।
১৮৯৭ সালে জন্ম নেওয়া আবুল হুসেন ১৯১৪ সালে যশোর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএ ও বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২০ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২২ সালে বিএল এবং ১৯৩১ সালে এমএল ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে কলকাতার হেয়ার স্কুলের শিক্ষকতা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেন। বছরখানেক পর ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের লেকচারের পদসহ মুসলিম হলের হাউজ টিউটর নিযুক্ত হন।
হুসেন ছিলেন যুক্তিবাদী। কৃষিবিপ্লব, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্হা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, হিন্দু-মুসলমান ঐক্য—এসব নীতির অক্লান্ত প্রচারক। তার রচিত ‘বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা’ (১৯২৮ সালে প্রকাশিত) গ্রম্হে বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা নিয়ে এত বিস্তৃত, গভীর ও বাস্তবায়নমুখী চিন্তা তত্কালীন সময়ে কোনো চিন্তক করেননি। একই সালে প্রকাশিত হয় তার জনপ্রিয় গ্রম্হ ‘মুসলিম কালচার’। আবুল হুসেন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা সাহিত্য, গণিত এবং আইনের পাঠ্যপুস্তকেরও রচয়িতা। তার রচিত উল্লেখযোগ্য সমালোচনামূলক গ্রম্হ নারীর অধিকার এবং সুলতানার স্বপ্ন।
আবুল হুসেন আরো একটা পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন—‘তরুণ পত্র’। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় তার সাড়া জাগানো প্রবন্ধ ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’। এটি প্রবল বিতর্ক তৈরি করে। ঢাকার বলিয়াদির জমিদার খান বাহাদুর কাজেমউদ্দিনের উদ্যোগে বিচারসভা বসে ১৯২৮ সালের ২০ আগস্ট। আবুল হুসেনকে দিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে নেওয়া হয় যে এই জাতীয় লেখা তিনি আর লিখবেন না।
১৯২৯ সালে ঢাকার ‘শান্িত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এবার নালিশ যায় খোদ ঢাকার নবাবের কাছে। নবাববাড়িতে বিচারসভা বসে ১৯২৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। হুসেন ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আমি অপরাধী এটা স্বীকার করে কোনো রকম শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পান। একমাত্র তার সহকর্মী কাজী আবদুল ওদুদ ছাড়া এই বিপদে কেউ তার পাশে ছিলেন না।
মনীষী কাজী মোতাহের হোসেন তার স্মৃতিকথা বইতে আবুল হুসেন প্রসঙ্গে লেখেন—‘জ্ঞানের সম্মার্জনীতে আবর্জনা দূর হয় সত্য, কিন্তু সকলের পক্ষে তা সুস্হ হয় না। তাই আবুল হুসেনকে নানা বিপদ-আপদ ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তবু তিনি নির্ভীকভাবে জ্ঞান-শিখা প্রজ্বালিত করে ঘুমন্ত সমাজে ‘জাগরণ’-এর বার্তা ঘোষণা করেছেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে এমএ পাশ করা আবুল হুসেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম আইনে স্নাতকোত্তর। ওয়াক্ফ আইনের বিশেষজ্ঞ মুক্তবুদ্ধির এই মানুষটি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪১টি বছর।
লেখক:প্রাবন্ধিক, প্রকৌশলী
