দেখা যাইতেছে নানান ঘটনার ঘনঘটা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২২, ০৫:৩০

কী হইতেছে বিশ্ব জুড়িয়া? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচাইতে ভয়ংকর ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ৯/১১-এর হামলার চাইতেও বিশ্বে অনেক অধিক প্রভাব ফেলিবে বলিয়া মনে করেন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা। এই দিকে চীনের সহিত উত্তেজনা বাড়িতেছে পশ্চিমা দেশগুলির। তাইওয়ানসংলগ্ন সমুদ্র এবং আকাশপথে পুনরায় মহড়া চালাইয়াছে চীন। এই অবস্হায় অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির যৌথ সামরিক মহড়া হইবে ইন্দো-প্যাসিফিকে। জার্মানি মোট ১৩টি যুদ্ধবিমান পাঠাইয়াছে। এই যুদ্ধবিমানগুলি অংশ লইবে ‘পিচ ব্ল্যাক’ প্রশিক্ষণ মহড়ায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিমানও তাহাতে অংশ লইবে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলিলেও বর্তমানে ইউক্রেন হইতে সারা বিশ্বে খাদ্য রপ্তানি শুরু হইয়াছে বটে। তবে ইহার পরও বিশ্বে খাদ্যসংকট কাটিতেছে না। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি জানাইয়াছে, বিশ্বে ১৫৩টি দেশে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি হইয়াছে ৮১ শতাংশ। ছোট-বড় কিংবা উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে বিশ্বের বহু দেশ এখন প্রবল অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দার ঝুঁকিতে। ইহার মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি পরপর দুই প্রান্িতকে, আর যুক্তরাজ্যের জিডিপি এক প্রান্িতকে সংকুচিত হইয়াছে। এইভাবে আগামী ছয় মাস হইতে এক বত্সরের মধ্যে বহু দেশ মন্দায় পড়িতে পারে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করা হইয়াছে। কিছু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেমন ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ রাখঢাক না করিয়াই বলিয়াছে, এই বত্সরের শেষের দিকে বড় ধরনের বৈশ্বিক মন্দা হইবে। যুদ্ধে যে সকল দেশই একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহা নহে। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধি আনিয়া দিয়াছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে উত্পাদন বাড়ে, বেকারত্ব কমে এবং মূল্যস্ফীতি আটকে থাকে মাত্র ১ শতাংশের ঘরে। কিন্তু পরিস্হিতি পালটাইয়া যায় ১৯৬৫ সাল হইতে। ১৯৮০ সালে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। এই জন্য ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলিয়াছিলেন সেই বিখ্যাত উক্তি—‘মূল্যস্ফীতি হইতেছে ছিনতাইকারীর মতো হিংস্র, সশস্ত্র ডাকাতের মতো ভয়ংকর এবং খুনির মতোই প্রাণঘাতী।’

সারা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ, বিশেষ করিয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এখন ‘মূল্যস্ফীতি’ নামক হিংস্র ছিনতাইকারী, সশস্ত্র ডাকাত-খুনির কবলে পড়িয়াছে। তবে একটি ভালো সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে দেশটির কর্মসংস্হান বৃদ্ধি এবং নূতন নূতন কর্মসংস্হান সৃষ্টির। স্বাস্হ্যসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা উন্নত করা। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই আলোর পরিবর্তে আলেয়া দেখা যায়। এই জন্য তৃতীয় বিশ্বের মতো দেশগুলির সাধারণ মানুষের একটিই স্বপ্ন—‘ভাত-কাপড়ে’ একটু দুশ্চিন্তামুক্ত হইয়া জীবন যাপন করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্হিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য তাহাদের দৈনন্দিন চাহিদা মিটাইতে হিমশিম খাইতেছে। যদিও তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে খ্যাতি পাইয়া আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলিয়া থাকে। এই রোল মডেল আসলে কী ব্যাপার—তাহা আমজনতার নিকট সহজবোধ্য নহে। অনেকের মতে, ‘মডেল’ বলিতে আমজনতা সাধারণত বুঝিয়া থাকে স্বল্প কাপড়ে আবৃত ফ্যাশন র্যাম্পের নারীদের। কিন্তু অবস্হা যেহেতু সারা বিশ্বেরই খারাপ, এমতাবস্হায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির করণীয় কী? এই অবস্হা উত্তরণের জন্য দাওয়াই কী? অর্থনীতির হিসাবনিকাশ বহু ক্ষেত্রেই জটিল। আশির দশকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হইতে বাঁচিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক কৌশল হিসাবে অর্থনৈতিক মন্দাকে বাছিয়া লইয়াছিল। এই জন্য মার্কিন ফেড মুদ্রা সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমাইয়া দিয়াছিল, বাড়াইয়াছিল সুদহার। তাহাতে কমিয়া যায় উত্পাদন। মানুষের হাতে নগদ অর্থ হ্রাস পায়। ইহাতে কমে চাহিদা। সারা বিশ্বের যেই অবস্হা তাহাতে পরিস্হিতি কোন দিকে যায়, তাহা সুনিশ্চিত করিয়া কেহ বলিতে পারে না। তবে পরিস্হিতি যেই দিকেই যাউক, আমরাও পরিস্হিতির শিকার হইব।

সমস্যা হইল, যুদ্ধের ভিতরে সকল কিছু ডাইভার্টের চেষ্টা করা হয়। এই জন্য ১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এইচ ওয়ারেন জনসন বলিয়াছিলেন, ‘দ্য ফার্স্ট ক্যাজুয়ালিটি হোয়েন ওয়ার কামস ইজ ট্রুথ।’ সহজ কথায়—যুদ্ধাবস্হা তৈরি হইলে সবচাইতে আগে আঘাতপ্রাপ্ত হয় ‘সত্য’ এবং বাকস্বাধীনতা। এই জন্য যুদ্ধাবস্হার সময় মনোযোগ ঘুরানোর জন্য বিচিত্র সকল কাণ্ড করা হয়। আমরাও এই ধরনের নানান ঘটনার ঘনঘটা দেখিতে পাইতেছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন