ব্রিটেনে একজন অশ্বেতাঙ্গ নাগরিক এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে কাছাকাছি অবস্হানে পৌঁছেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অবশেষে অফিস থেকে সরে গেলে তার স্হলাভিষিক্ত হবেন হয় ঋষি সুনাক অথবা লিজ ট্রাস। ঋষি সুনাক পূর্ব আফ্রিকা হয়ে আসা ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সন্তান। পক্ষান্তরে লিজ ট্রাস সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মতো ভাবমূর্তির পরিচয় প্রদান করে চলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রথম থেকেই অনেক ধুমধাম লক্ষ করা যাচ্ছে। শুরুতে কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থীসংখ্যা ছিল আট। এর অর্ধেকই ছিল বর্ণগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে আগত। এটি দেশের পরবর্তী নেতার জন্য সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রতিযোগিতার প্রতিনিধিত্ব করে, যা এর আগে আর কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু ব্রিটিশ রাজনীতিতে আমরা যে সংকটময় মুহূর্তে রয়েছি, তার একটি সংকেত হলো এই প্রতিযোগিতার পুরো পর্বটি এক নিখুঁত অভিনয়। এতে এই বৈচিত্র্য বর্ণবাদবিরোধী শত্রুতে রূপান্তরিত হতে পারে।
এখানে প্রতিনিধিত্ব একটি ব্যাপার বটে। কিন্তু সুনাক যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদের শিকার হওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন না। কারণ এটা শুধু তার পরিবারের বিরুদ্ধে কোটিপতি কর ফাঁকিবাজ বলে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নয়। (গত এপ্রিল মাসে ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সুনাকের বহু-মিলিওনিয়ার ভারতীয় স্ত্রী অনাবাসিক মর্যাদা ধারণ করছেন। এর ফলে তাকে যুক্তরাজ্যে বিদেশি উপার্জনের ওপর কর প্রদান করতে হবে না। এটি এমন এক বৈধ ব্যবস্হা, যা চ্যান্সেলরের স্ত্রীর ক্ষেত্রেও ছিল প্রযোজ্য ও বিশ্রি প্রকৃতির এবং চ্যান্সেলর এটি পরিবর্তন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।)
যখন তিনি চ্যান্সেলর ছিলেন, তখন জনসন মন্ত্রিসভায় সুনাককে অন্তভুর্ক্ত করে ব্রিটিশ ইতিহাসে তার সরকার যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় তার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। (অথচ গত মাসে তার সরকার থেকে সুনাকের পদত্যাগের পর জনসনের প্রতি আস্হা হারানো মন্ত্রীদের পদত্যাগের বন্যা বয়ে যায়। আর এ কারণেই সার্বিক পরিস্হিতি এই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার দিকে টেনে নিয়ে যায়)।
এসব বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও জনসন সরকার স্মরণাতীতকালে সবচেয়ে খোলামেলা বর্ণবাদী নীতি ও এজেন্ডা অনুসরণ করেছে। ব্রিটেনে অভিবাসননীতি সর্বদা তথাকথিত বর্ণবাদ সমস্যার পক্ষে প্রতিরক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ব্রিটেন তার ঔপনিবেশিক সহিংসতা মূলত তার প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে বজায় রেখেছিল। প্রযুক্তিগত উন্নতির পরই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়। এর পরই ব্রিটেনকে বিপুলসংখ্যক বর্ণগত সংখ্যালঘুর মোকাবিলা করতে হয়েছে।
১৯৫০ দশকের শেষের দিকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে কালো ও বাদামি অভিবাসীরা ব্রিটেনে থাকতে এসেছে, তখন অভিবাসননীতির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ‘ব্রিটেনকে শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশ হিসেবে রাখার’ জন্য অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসন হ্রাস করা। এর ফলে অবশেষে ‘প্রতিকূল পরিবেশ’-এর সৃষ্টি হয় এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন চেক বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এতেই সংঘটিত হয় উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারি ২০১৭ সালে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। দেখা গেল, অগণিত লোক, যারা কয়েক দশক ধরে বৈধভাবে এই দেশে বসবাস করে আসছেন, তারা হঠাৎ তাদের চাকরি হারিয়ে ফেলেছেন এবং তাদের অবস্হান প্রমাণ করতে না পারায় তারা গ্রেফতার ও নির্বাসনের শিকার হচ্ছেন।
স্বরাষ্ট্রসচিব প্রীতি প্যাটেল বিষয়টিকে আরো খারাপ করে তোললেন। তিনি যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া নৌকাগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন। এতে অনেকের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং যারা অবৈধভাবে ব্রিটিশ জলসীমায় আসছিল, তাদের রুয়ান্ডায় নির্বাসিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সে সময় প্যাটেল স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক অভিবাসন আইনের কারণে তার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ আইন এতটাই কঠোর ছিল যে, উগান্ডা থেকে আগত তার নিজের ভারতীয় বংশোদ্ভূত পিতামাতার যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। তিনি ‘ব্রিটেনকে সাদা রাখুন’ এজেন্ডার প্রতি এতটাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, যেন তার পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপটি হলো অবশ্যই নিজেকে নির্বাসিত করা।
প্যাটেলের সাম্প্রতিক পুলিশিং বিলটি পাশ হয় মূলত জর্জ ফ্লয়েডের মৃতু্যর ফলে উদ্ভূত বিক্ষোভকে বেআইনি ঘোষণা করে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর বিক্ষোভগুলো কতটা ‘ভয়ংকর’, তা তিনি তার বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলেছেন।
এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে সবচেয়ে বর্ণবাদী নীতি একজন অশ্বেতাঙ্গ মুখপাত্রের কাছ থেকে এসেছে। প্যাটেলের বৈচিত্র্যই হলো একটা ব্যাপার, যাকে দিয়ে এই কাজ করানোটা সুবিধার হয়েছে। সুনাক এ ধরনের ইসু্যতে প্রকাশ্যে বিদ্বেষী ছিলেন না, তবে তিনি সরকারের পক্ষে কাজ করেন এবং তার কঠোর অভিবাসন অবস্হান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় নির্বাসন, বিদেশি বংশোদ্ভূত অপরাধীদের ক্রমবর্ধমানসংখ্যককে নির্বাসন, এমনকি মোট শরণার্থীসংখ্যার ওপর একটি ক্যাপ প্রস্তাব করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কোনো ভুল করবেন না, তিনি ধারাবাহিকভাবে একজন প্রার্থী এবং তার পূর্বসূরি হিসেবে তিনি একই বর্ণবাদী জাহাজ পরিচালনা করবেন।
ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী সেপ্টেম্বরের শুরুতে ১ লাখ ৬০ হাজার কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। এসব সদস্যের প্রত্যেকের রয়েছে ভোটাধিকার। আপনি হয়তো ভাবছেন, কেন জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বৃহত্তর জনগণের ভোট অনুষ্ঠিত হবে না? তার কারণ, ব্রিটেনের পুরোনো সরকারব্যবস্হা আসলে এমনই। রানি রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি রানির ‘অধিকারে’ কাজ করেন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নির্বাচিত হন না। তাই তারা যখন পদত্যাগ করেন, তখন যিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, তিনি দেশ চালান। তবে তারা অনির্বাচিত হলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের চেয়েও বেশি ক্ষমতার অধিকারী। এই সিস্টেমে কিছু ভারসাম্য রয়েছে। নির্বাচিত সংসদ আইন পাশ করে যা অনির্বাচিত হাউজ অব লর্ডস দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তারা যাচাই-বাছাই করেন বটে, কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কম রাখেন।
জনসনের কাছ থেকে যিনিই দায়িত্ব গ্রহণ করুন না কেন, পার্লামেন্টে তার বৃহত্ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং তারা যে কোনো আইন কার্যকরভাবে পাশ করতে পারেন। তত্ত্বগতভাবে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারেন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন নির্বাচিত হলেন, তখন কংগ্রেস কোনো প্রতিকূলতা সৃষ্টি করেনি। এমনকি বর্ণগত অগ্রগতির যুগের সূচনা করার ক্ষেত্রেও। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ঋষি সুনাক জিতলে আমরা দেখতে পাব ঠিক উলটোটা। কারণ কনজারভেটিভ পার্টির যেসব সদস্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভোট দিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই জাতিগত ন্যায়বিচারের জন্য উদারপম্হি নন। সদস্যপদে সবচেয়ে আবেদনময়ী প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছিলেন নাইজেরিয়ান অভিবাসী কেমি ব্যাডেনোচ, যিনি সমালোচনামূলক জাতিতত্ত্ব, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার ওপর তার আক্রমণের মাধ্যমে অ্যান্টি-ওয়েক ব্রিগেডের রানি হয়েছিলেন। তিনি এতটাই চরম যে, ডানপম্হি জাতীয়তাবাদী দল ব্রিটেন ফার্স্ট তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে বলে জানা গেছে।
যে কেউ দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার আশা করতে পারেন। তবে এজন্য তিনি সংসদ সদস্যদের ইচ্ছার কাছে বিশ্বস্ত হতে বাধ্য। কনজারভেটিভরা সর্বদাই অভিবাসীবিরোধী। এটি কেবল একটি ব্র্যান্ড নয়, পার্টির ডিএনএর গভীরে রয়েছে। কালো ও বাদামি মুখরা পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন—এই ধারণা তাদের কাছে যতটা অবমাননাকর, ততটাই অযৌক্তিক। এটাই আসল বর্ণপরিচয়ের রাজনীতি। প্যাটেল, বাদেনোচ ও সুনাকের মতো ব্যক্তিদের রঙের কারণেই কালো ও বাদামি সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের পছন্দ করে এবং তাদের ভোট ব্যাংক ধরাই আসল উদ্দেশ্য।
প্রকৃতপক্ষে সর্বদাই এমন লোক ছিল, যারা নিজেদের সমৃদ্ধ ও সক্ষম করার জন্য জাতিগত নিপীড়নের শক্তির সঙ্গে সারিবদ্ধ হতে বেছে নিয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কেবল অগণিত কালো ও বাদামি মধ্যম ব্যবস্হাপক ছাড়া চলতে পারত না। এটা সত্য যে, একজনকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উন্নীত করা যেতে পারে, যা আসলে কোনো ধরনের বিজয় নয়। প্রকৃতপক্ষে সুনাকের বিজয় ব্রিটিশ বর্ণগত সম্পর্ককে জনসন সরকারের চেয়ে আরো পিছিয়ে দেবে। অগ্রগতির বিভ্রমের চেয়ে ক্ষতিকারক আর কিছুই নেই। কারণ এটি বাস্তব সমস্যাগুলোকে মুখোশের আড়ালে রাখে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
এই বর্ণবাদী সরকারের শেষ যে জিনিসটি প্রয়োজন, তা হলো টেবিলের মাথায় বাদামি মুখ থেকে পিআর বুস্ট। সুনাক জয়ী হলে তিনি প্রকাশ্যে একটি বর্ণবাদী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন, নরক তার ধ্বংসাত্মক এজেন্ডা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। কিন্তু যেহেতু একজন অশ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী এত দীর্ঘ সময় পর আসছেন, তাই আমাদের মধ্যে অনেকেই পরিবর্তন এসেছে বলে বিশ্বাস করতে পারেন। তবে এটা হবে নিজেদের প্রতারিত করার শামিল।
লেখক: বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির ব্ল্যাক স্টাডিজের প্রফেসর
সিএনন থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম
