শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বাগানের শ্রমিকেরা কাজে ফিরে গেলেন। হয়তো বাকিরাও ফিরবেন। কিন্তু কী হাতে নিয়ে ফিরবেন, তা জানি না। সে কি কেবল আশ্বাস? মৌলিভীবাজার জেলার শমসেরনগরের ফাঁড়ি কানিহাট চা-বাগানের এক শ্রমিক পরিবারের সন্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সন্তোষ রবিদাস তার শ্রমিক ‘মা’কে নিয়ে ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি শেষাংশে লিখেছেন, ২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ মা হিসেবে উপজেলায় মাকে সম্মাননা দেওয়া হবে বলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জানানো হয়। পরে মায়ের নামটা কেটে দেওয়া হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, মা আমার চা-শ্রমিক। স্টেজে উঠে নাকি কিছুই বলতে পারবেন না। তাই নাম কেটে দিয়েছে! মা এখনো প্রতিদিন সকালে একটা বোতলে লবণ, চা-পাতা ভর্তা, আটার রুটি, সামান্য ভাত পলিথিনে ভরে নিজের পাতি তোলার গামছায় মুড়িয়ে নিয়ে দৌড়ান চা-বাগানে। আট ঘণ্টা পরিশ্রম করে মাত্র ১২০ টাকা মজুরি পান! এই মজুরিতে কীভাবে চলে একজন শ্রমিকের সংসার? আজকাল মায়ের শরীর আগের মতো আর সায় দেয় না। মা বলেন, তোর চাকরি হইলে বাগানের কাজ ছেড়ে দেব।’ আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি...!’ এই স্টাটাস ব্যাপক আকারে ভাইরাল হয়। তারপর সন্তোষের পরিবারের দিকে এগিয়ে আসে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সন্তোষ ভাগ্যবান যে, সে লেখা-পড়া শিখতে পেরেছে। অথচ এখনো চা-শ্রমিকদের সন্তানেরা অধিকাংশই লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
গত ৯ আগস্ট থেকে দেশের ২৪১টি চা-বাগানে একযোগে ধর্মঘট শুরু হয়। তাদের দাবি, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করতে হবে। দেড় লাখের বেশি শ্রমিক চা-পাতা তোলার কাজ থেকে বিরত ছিলেন। চা-বাগানগুলোকে এ, বি এবং সি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এ শ্রেণির চা-বাগানেই দিনে সর্বোচ্চ মজুরি ১২০ টাকা। বি ও সি শ্রেণিতে তো আরো কম। প্রতি দুই বছর পরপর তাদের মজুরি বাড়ানোর কথা থাকলেও বিগত ২০১৮ সালের পর আর মজুরি বাড়ানো হয়নি। মজুরির বাইরে শ্রমিকেরা দুই টাকা করে সপ্তাহে তিন কেজি আটা পান। শ্রমিকদের ১২০ টাকা মজুরির মধ্যেও ফাঁক আছে। কমপক্ষে ২৪ কেজি চা-পাতা তুলতে পারলে ১২০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। এর কম হলে প্রতি কেজিতে ছয় টাকা করে কেটে নেওয়া হয়। যদি ২৪ কেজির বেশি হয়, তাহলে প্রতি কেজিতে মাত্র দুই টাকা বেশি দেওয়া হয়। শ্রমিকেরা যদি চা-বাগানের জমিতে ফসল বা শাক-সবজির চাষ করেন, তাহলে তাদের আবার রেশন দেওয়া হয় না।
এছাড়া তাদের চিকিত্সা ও আবাসন সুবিধা, সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থার কথা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবার কথা বলা হলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ছাড়া আর কিছু দেওয়া হয় না। আর সন্তানদের পড়াশোনার জন্য এনজিওর স্কুলগুলোতে পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়ানো হয় না। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে গাদাগাদি করে পরিবারের সবাইকে থাকতে হয়।
বাংলাদেশে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা উত্পাদন শুরু হয়। ইংরেজরা চা-শিল্পকে বিকশিত করতে ভারতের ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ থেকে দরিদ্র আদিবাসীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে চা-বাগানের কাজের জন্য সিলেট অঞ্চলে নিয়ে আসে। এরপর তাদের দিয়ে শুরু হয় পাহাড় পরিষ্কার করে বাগান তৈরির কাজ। ভূমিসহ নানান সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও যখনই শ্রমিকেরা তাদের অধিকার দাবি করেছে, তখনই নেমে এসেছে নির্মম নির্যাতন। এমন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ১৯২১ সালে সিলেট অঞ্চলের হাজার হাজার শ্রমিক দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনের ডাক দেন। তাদের স্লোগান ছিল ‘মুল্লুকে চলো’ (অর্থাৎ, বাড়িতে চলো)। সে বছরের ২০ মে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য ৩০ হাজার শ্রমিক সিলেট থেকে চাঁদপুর স্টিমারঘাটে পৌঁছান। সেখানে ব্রিটিশ অস্ত্রধারী সিপাহিরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে কয়েক শ শ্রমিক মারা যান। এর পর থেকে চা-শ্রমিকেরা এই দিনকে ‘চা-শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকেন।
বাংলাদেশে চা-শিল্পের বিকাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে ১৯৫৭-৫৮ সময়কালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। সে সময় তিনি চা-শিল্পের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। ঢাকার মতিঝিলে চা বোর্ডের প্রধান কার্যালয়, মৌলভীবাজারে টি-রিসার্চ গবেষণা স্টেশন নির্মাণ করেন। ‘টি অ্যাক্ট-৫০’ সংশোধনের মাধ্যমে চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু করেন। স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত চা-কারখানাগুলো চালু করার জন্য ১৯৭২ সালেই ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাক অব ইন্ডিয়া’ থেকে ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। তিনি চা-শ্রমিকদের বিনা মূল্যে বাসস্থান, সুপেয় পানি, প্রাথমিক শিক্ষা ও রেশনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকারও চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক কর্মসূচির আওতায় অনেক কাজ করেছে। এছাড়া প্রতিটি পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তথাপি ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও চা-শ্রমিকদের আমূল কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিল্পের উন্নতি হলেও চা-শ্রমিকদের জীবন বদলায়নি।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
