বাংলাদেশে বর্তমানে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যমান। বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইনের আওতায় এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবশেষ ২০১০ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে সেখানে উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর উক্ত আইনটি বর্তমানে সংশোধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সদস্য, কমিশনের একজন সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি কাজ করছে। ইতিমধ্যে এই কমিটি একটি খসড়াও তৈরি করেছে, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
যে খসড়া আইনটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেখানে ট্রাস্টি বোর্ডে ৩৩ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ জন শিক্ষাবিদ থাকতে হবে। এছাড়া উপাচার্য নিয়োগ সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় হবে। উপাচার্যকে সব আর্থিক ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাবনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের তাদের স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বহীন করা অথবা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়ার মতো একটি নেতিবাচক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ধরা যায়।
২০১০ সালের বিদ্যমান আইনে ট্রাস্টি বোর্ড ও উদ্যোক্তাদের তেমন কোনো ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি। এর পরও ট্রাস্টি বোর্ডের হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ এবং গুজব রয়েছে, যেমন :উপাচার্যগণ ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করতে পারেন না, ট্রস্টি বোর্ড বিভিন্নভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করে থাকে, ট্রাস্টি বোর্ড ক্রয়-বিক্রয়, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করে থাকে ইত্যাদি। ২০১০ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ভুলের কারণেই এসব অনিয়ম ও অভিযোগের তির ট্রাস্টি বোর্ডের দিকেই নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বা স্থাপনের জন্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তটি ২০১০ সালের আইনের বড় একটি ভুল আইন ছিল এবং এই ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের বিধান রাখার ফলেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাস্টি বোর্ড এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে নিয়ম অনুযায়ী কোনো আর্থিক বা অন্যান্য কোনো প্রকার সুবিধা কেউ গ্রহণ করতে পারবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে যারা শিল্পপতি তাদের কথা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পপতিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যারা একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে গিয়ে নিজেদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেছে, কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, জীবনের মূল্যবান সময়, মেধা ব্যয় করেছে অথচ তাদের কোনো অধিকার ২০১০ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে যখন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ট্রাস্টি বোর্ড কোনো হস্তক্ষেপ করতে যায়, তখনই সেটা ২০১০ সালের আইনের চোখে অপরাধ বা আইনপরিপন্থি কাজে পরিণত হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের নামে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরকম অভিযোগ ইউজিসি বা সরকারের নিকট রয়েছে। এসব অভিযোগ বিদ্যমান আইনের ভুলের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। এরকম একটি ভুল আইনের সংশোধনের মাধ্যমে আবারও ট্রাস্টি বোর্ড ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে আটকানো বা গুরুত্বহীন করার নানাবিধ প্রচেষ্টা মাত্র। এতে আইনের চোখে আরো দ্বিগুণ হারে অভিযোগ ও অপরাধ বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।
সত্যিকারে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বাস্তব অবস্থার নিরিখে আইন প্রণয়ন অতীব জরুরি। দেশের প্রাইভেট শিক্ষা সেক্টরকে মালয়েশিয়া, ভারতের মতো দেশি-বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত করার জন্য আইনি ব্যবস্থায় অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে এ খাতেও বিদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা গার্মেন্টস সেক্টরের মতো অর্থনৈতিক বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়। এখানে নেতিবাচক চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই কারণ সময় এখন বদলেছে। একসময় ইউজিসি বা সরকার দূরশিক্ষণ বা অনলাইন শিক্ষা কোনোভাবেই সমর্থন করত না; কিন্তু বর্তমানে দূরশিক্ষণ বা অনলাইন শিক্ষা সরাসরি সরকার এবং ইউজিসির আদেশেই পরিচালিত হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। যেখানে অন্যান্য দেশ তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সমগ্র পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে সেখানে আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গন তো দূরে থাক, দেশের অভ্যন্তরেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকীর্ণ রূপ দানের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাশের দেশ ভারতে তিন পদ্ধতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায় : ১) বিদ্যমান সোসাইটি অ্যাক্টের আওতায়, ২) বিদ্যমান ট্রস্টি আইনের আওতায়, ৩) কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কোম্পানি ও সংস্থার আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালিত হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশেই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সম্ভব নয়। কিন্তু কেন? কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়টি আইনে অন্তভুর্ক্ত করা অত্যন্ত জরুরি বলে অনেকে মনে করেন। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, ‘কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত হলে উদ্যোক্তাদের আর্থিক অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে।’ মোটেই অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে না। যদি আইনের মধ্যেই উদ্যোক্তাদের নিয়মমাফিক আর্থিক সুবিধা বা সম্মানি গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে অনিয়মের প্রশ্নই ওঠে না। তার পরও যদি কেউ অনিয়ম করে, সেক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে স্থাপিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারি কোনো সহায়তা প্রদান করা হয় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়গুলোকে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষার্থীপ্রতি রাষ্ট্রের খরচ প্রায় তিন থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পেছনে রাষ্ট্রের কোনো খরচ নেই। কিন্তু একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানের খুব বেশি তারতম্য নেই। বাস্তবতা হলো, বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলো থেকে এগিয়ে আছে।
কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গবেষণা পরিচালনা শুরু করেছে, সেখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষক রয়েছেন, যা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনকাঠামো দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অবকাঠামো, ল্যাব ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এগিয়ে রয়েছে। এসব উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে কেবল উদ্যোক্তাদের নিরলস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। উদ্যোক্তাদের মেধা, স্বপ্ন ও বিনিয়োগের সদিচ্ছার মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক সমমানের করার সদিচ্ছা এখানে গভীরভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করে যে খসড়া আইন প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে এসব দক্ষতাসম্পন্ন উদ্যোক্তাগণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিরুত্সাহিত হবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসমূহ অন্য কোনো শিল্প কলকারখানা বা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যেসব উদ্যোক্তা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থাপন করেছে তারা যদি এগুলো বন্ধ করে দেয় তাহলে কি সরকার এগুলোর দায়িত্ব কোনোদিন নেবেন? অথবা যদি নতুন সংশোধনী আইনের কারণে উদ্যোক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় তাহলে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোথায় যাবে? অথবা ভবিষ্যতে যে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসবে তারা কোথায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে? এর উত্তর হলো, এসব শিক্ষার্থী তখন উচ্চশিক্ষার জন্য পাশের দেশ ভারতে যাবে, মালয়েশিয়া যাবে, নেপালে যাবে, চীনে যাবে। তাতে লাভ কার আর ক্ষতি কার, সেটা সহজেই অনুমেয়। যেখানে আশির দশকে মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে এসে পড়াশোনা করত, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মালয়েশিয়া গিয়ে পড়ালেখা করে। সরকারের দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।
সত্যি কথা বলতে কি, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইনি শাসন বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যায় না। সেজন্যই বারবার আইন সংশোধনের প্রয়োজন হয়। সুতরাং নতুন করে একতরফা আইন করে চাপিয়ে না দিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে শিক্ষার উন্নয়ন ও জাতির কল্যাণে আইনের খসড়া প্রণয়ন অতীব জরুরি, নতুবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যা বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার জন্য।
লেখক : চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, বরিশাল
