চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শেষ পর্যন্ত হোঁচট খেলেও রাশিয়ার পাওয়ার স্ট্রাকচারে (ক্ষমতাকাঠামো) কোনো পরিবর্তন আসবে না, বরং পুতিনের যবনিকাপাত, মানে আরেকজন নতুন পুতিনের আগমন ঘটবে। পুতিনের উত্তরসূরিও পুতিনের পথই অনুসরণ করবেন। তারপর ঘটবে একই ঘটনা। বিষয়টি ঠিক আমার উপন্যাসের একটি লাইনের মতো—‘প্রথম পৃষ্ঠায় যুদ্ধ, শেষের পৃষ্ঠায় ‘ক্রসওয়ার্ড’ (শব্দের ধাঁধা—পাজল)। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কয়েক দিন পর ট্রেনে ভ্রমণকালে আমার লেখা ‘দ্য লাইট অ্যান্ড দ্য ডার্ক’ উপন্যাসের সেই লাইনটি মনে পড়ে আবারও। আমার পাশে বসে একজন যাত্রী কাগজ পড়ছিলেন; কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছিল যুদ্ধের কথা; পেছনের পৃষ্ঠায় ক্রসওয়ার্ড। সেদিনের পর থেকে লম্বা সময় অতিবাহিত হয়েছে। প্রতিদিনের নৃশংস ঘটনাগুলো শিরোনাম থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করে। যদিও যুদ্ধ দিনকে দিন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। পশ্চিমে এখন কেউ আর যুদ্ধের কথা শুনতে চায় না। ভয় ও সংহতির প্রশ্নে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মানুষ। মানুষ শান্তি চায় এখন। শান্ত জীবন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি না হওয়া এবং সুন্দর অবকাশ যাপন চায় সবাই।
বিষয়টি এমন নয় যে, আসন্ন ভয়াবহতার ব্যাপারে প্রথম বার সতর্ক করছে আমার লেখা। ক্রিমিয়াকে অন্তভুর্ক্ত করার সময়ও লিখেছি। ইউরোপের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বর্ণনা করতে আমার লেখায় রাশিয়ান লোককাহিনি তেরেমোকের (ফাস্ট ফুডের দোকান) সঙ্গে একটি সাদৃশ্য ব্যবহার করেছিলাম। লোককাহিনিটি বেশ প্রাসঙ্গিক। একদা কিছু বনের প্রাণী ছিল, যারা একটি আরামদায়ক ছোট্ট বাড়িতে একসঙ্গে থাকত। তো একদিন একটা ব্যাঙ তেরেমোকের দরজায় কড়া নাড়ল—‘খট খট! এই তেরেমোকে কে কে থাকে? আমাকে ঢুকতে দাও, আমি এখানে তোমাদের সাথে থাকতে চাই।’ বসবাসকারীরা ব্যাঙকে ঢুকতে দেয়। সবার সম্মিলিত বসবাসে তেরেমোকটি ছিল একটি সুখী ও আরামদায়ক। এমনকি রূপকথার ‘কাইওয়ার্ড নামের খরগোশ ও রেনার্ড নামের শেয়াল’কেও থাকতে দেয় তেরেমোকেতে। তেরেমোকে জায়গা হয় সবার। তারপর একদিন আসে ভালুক ব্রইন। ঝামেলা বাধে এখানেই। বহু চেষ্টার পরও তেরেমোকে খাপ খাওয়াতে পারে না সে। অতঃপর সে রাগ হয়ে ঘরের ওপরে বসে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গেই নাশ হয় তেরেমোক। সেখানেই সমাপ্তি হয় রূপকথার।
রূপকথার আদলে লেখা এই সতর্কবার্তায় কোনো ধরনের কর্ণপাত করা হয়নি। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের পরপরই আমি জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলাম, ‘২১ শতকে কোনো স্থানীয় যুদ্ধই এখন আর দূরের কোনো বিষয় নয়। প্রতিটি যুদ্ধ এখন ইউরোপীয় যুদ্ধ এবং এই ইউরোপীয় যুদ্ধ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।’ আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, ভ্লাদিমির পুতিনের ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করা ‘দেশপ্রেমের ঢেউ তুলবে। খুব তাড়াতাড়ি কিংবা পরবর্তী সময়ে এই ঢেউয়ের রেশ মিলিয়ে যাবে। তার পরে আরো একটি নতুন ঢেউ সামনে আনবে পুতিন। আমি লিখেছিলাম, বলকান অঞ্চলে দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীলতার কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ‘ইউক্রেন থেকে উদ্বাস্ত্তদের একটি অকল্পনীয় বড় ঢেউ’ আছড়ে পড়বে। বিপর্যয়করভাবে উচ্চমাত্রার অভিবাসন তৈরি হবে।
তখন থেকেই আগ্রাসন থামানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু ইউরোপীয় রাজনীতিবিদেরা ভোটারদের অনুগ্রহ পাওয়ার লোভে বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেন। চোখ বন্ধ করে রেখেছেন তারা। প্রকৃতপক্ষে ভোটাররা শান্তি চেয়েছিলেন—শান্ত জীবন, কোনো মূল্যবৃদ্ধি না হওয়া এবং চমত্কার হলিডে। যদিও সে সময় দুর্নীতিগ্রস্ত রাশিয়ান বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছিলেন অন্য বিষয়ে। তাদের ভাষ্য ছিল, ‘আমাদের পুতিনের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা উচিত এবং তাকে ছাড় দেওয়া উচিত।’
এখন আমরা কী দেখছি? কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা? এর উত্তরে বলতে হয়, ‘একটি ইউরোপীয় যুদ্ধের মাঝখানে। ইউক্রেন থেকে বিপুল পরিমাণ উদ্বাস্ত্তর অভূতপূর্ব ঢেউয়ের মুখোমুখি।’ আমরা এখন ভাবছি, আমাদের রাজনীতিবিদেরা এত অন্ধ হতে পারেন কীভাবে! বস্ত্তত, লেখকদের কথা এখন আর কেউ শোনে না। ইতিহাস থেকে আমরা একমাত্র সত্য শিক্ষা নিতে পারি যে, ‘ইতিহাস কিছুই শেখায় না।’
ইউক্রেনে সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে একটি পিটিশনে হাজার হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন জার্মানির বুদ্ধিজীবীরা। এটি করার কারণ হলো, তারা মনে করছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা না হলে পরিস্থিতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তারা বলছেন, ‘আমরা শান্তির নীতি চাই, যুদ্ধ নয়।’ কিন্তু মনে রাখতে হবে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এটি মূলত শুরু হয় ২০১৪ সালেই। দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আপনি কীভাবে কারো অন্ধত্ব নিরাময় করবেন, যদি কেউ অন্ধই থাকতে চায়?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধের অবসান হবে কীভাবে এবং তা ঠিক কবে, কোন সময়ে? হিটলারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়নি নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যদিও একটি বিধ্বংসী সামরিক ব্যবস্থার পরাজয় ঘটেছে বটে। একদিন পুতিনেরও মৃত্যু হবে অনিবার্যভাবে; কিন্তু একে রাশিয়ার পরাজয় বলা যাবে না কোনোভাবেই।
‘যুদ্ধের অবসান হবে কীভাবে এবং তা ঠিক কবে, কোন সময়ে’—এই প্রশ্নের উত্তর বেশ দোদুল্যমান। উত্তর বেশ জটিল—কিছু জার (রাশিয়ার শাসক) আসল; কেউ কেউ জাল, নকল, বেঠিক। পবিত্রভূমি রাশিয়া যদি তার অঞ্চল প্রসারিত করে এবং সেখানকার জনগণ মস্কোর স্বৈরশাসকের সামনে মাথা নত করে, তবে জমিনপ্রজা যে জনগোষ্ঠী পরিশ্রম ও সংগ্রাম করে এবং বীরত্বের সঙ্গে পবিত্র পিতৃভূমির জন্য রক্ত ঝরায়, তারা মনে করে এটি ঈশ্বরের আশীর্বাদ। এবং তার পরে দেখা যায়, জার কীভাবে ক্ষমতায় এসেছেন বা কীভাবে তিনি তার প্রজাদের ওপর শাসন চালিয়েছেন, তা খুব একটা বিবেচ্য নয়। জার তাদের লাখে লাখে জবাই করতে পারেন, হাজার হাজার গির্জা ধ্বংস করতে পারেন এবং পুরোহিতদের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, জারই আসল; কারণ তার দাপটে শত্রু কাঁপে এবং পবিত্র ভূমি প্রসারিত হয়। স্ট্যালিনের সঙ্গে এমনটাই হয়েছিল।
বিপরীত চিত্রও আছে। সামরিক ব্যর্থতা, এমনকি পবিত্র ভূমির একটি ছোট অংশের ক্ষতিকেও বিপর্যয়ের ‘স্পষ্ট চিহ্ন হিসেবে দেখে থাকে জার প্রজারা। তখন তাদের মনে হয়, ‘জার আশীর্বাদপ্রাপ্ত নয়; জার অবৈধ, জাল’। সিংহাসনে থাকা লোকটি নিজেকে একজন জার হিসেবে জাহির করা নিপুণ অভিনয়শিল্পী মাত্র। দ্বিতীয় নিকোলাস ও বরিস ইয়েলসিৎনের বেলায় এমনটিই হয়েছিল।
পুতিন ক্রিমিয়া পুনরুদ্ধার করে তার প্রেসিডেন্সি ক্ষমতাকে বৈধ করে নিয়েছেন। কিন্তু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে জয়ী হতে না পেরে তার বৈধতা এখন বাষ্পায়িত হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে পরবর্তী জার কে। কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করার হুমকি পুতিনের জন্য যদি শুধু বড়-ব্যাপক যুদ্ধের একটি দিক হয়, তবে মনে রাখতে হবে, পরবর্তী পুতিনের (যেমনটি বলা হয়েছে পুতিনের পর আরেকজন পুতিন আসবেন) জন্য তা মোতায়েনের দরকার পড়বে। এর মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা চালাবেন তিনি। এটিই হয়ে উঠবে তার ‘অতি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার’।
পরবর্তী পুতিনও হবেন একজন অভিনেতা বই কিছুই নয়। কেননা, তিনি তার ভূমিকা পরিবর্তন করতে পারবেন না কোনোভাবেই। তার ভূমিকা পুরো রাশিয়ান শক্তিকাঠামো দ্বারা পূর্বলিখিত হবে। এর ফলে ইউক্রেন বা রাশিয়ায় বা অন্য যেখানেই হোক না কেন, কত লোক মারা যাবে তা নিয়ে তার কোনো চিন্তা থাকবে না। সামরিক সংস্থানের ব্যয় নিয়ে তার কোনো ধরনের মাথাব্যথা থাকবে না। ঠিক কী পরিমাণ অস্ত্র মোতায়েন করা হবে কিংবা সামরিক হতাহতের মাত্রা কত হবে—এসব তাকে উদ্বিগ্ন করবে না মোটেই। এবং এসবের ফলে যদি রাশিয়ান জীবনমানের অবনতি হয়, তাতেও কোনো প্রভাব পড়বে না তার কাজের ওপর। বস্তুত, শাসকগোষ্ঠী কখনোই নিজের জনগণের সুখের কথা চিন্তা করেনি।
রাশিয়ান স্বৈরাচারের প্রাচীন সামাজিক কাঠামো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়ে আসছে। ফিরে ফিরে এসেছে নতুন ছদ্মবেশে। সময়ে সময়ে খোলস-চামড়া বদল করেছে মাত্র। গোল্ডেন হোর্ডের খানাতে বা মস্কোর জারডম, রোমানভস সাম্রাজ্য বা স্ট্যালিনের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে এবং অতি সম্প্রতি পুতিনের ‘পরিচালিত গণতন্ত্র’ হিসেবে রূপ ধারণ করে চলেছে স্বৈরতন্ত্রের এই কাঠামো। এবং এখন রাশিয়ান ফেডারেশন আরো একবার তার চামড়া বদলাচ্ছে। ‘অপরাজিত সামরিক স্বৈরশাসনের অটুট ভিত্তি থেকে ফেডারেশন বের হতে পারবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। দেখার বিষয়, ফেডারেশন কি স্বাধীন সাংবিধানিক গণতন্ত্র হতে পারে, যা স্বেচ্ছায় পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করবে?’— এই কথাগুলো প্রতিটি মানুষের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও মানুষ শান্তি চেয়েছিল। মূল্যবৃদ্ধি নয়, সুন্দর অবকাশ চেয়েছিল মানুষ। ভোটাররা আশা করেছিল, ফ্রান্স ও ব্রিটেনে গণতান্ত্রিক সরকারগুলো হিটলারের সঙ্গে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির নীতি অনুসরণ করবে। কিন্তু এর পরে যা হয়েছে তা আজ ইতিহাস। ভোটারদের উদ্দেশ্যে উইনস্টন চার্চিলের নির্মম সত্য ও দুঃখজনক বার্তা ছিল—‘আমার কাছে রক্ত, পরিশ্রম, অশ্রু ও ঘাম ছাড়া আর কিছুই নেই দেওয়ার মতো।’
খুব দ্রুত কিংবা দেরিতে হলেও এই একই কথা শোনা যাবে আবারও। সুন্দর হলিডের পরিবর্তে ইউরোপীয় জনগণকে অবশ্যই মহান ত্যাগ, সংগ্রাম ও কষ্টের জন্য নিজেদের ইস্পাত হিসেবে তৈরি করতে হবে। কারণ, শান্িতর জন্য অনেক বড় মূল্য চোকাতে হয়।
লেখক : রাশিয়ান বুকার, রাশিয়ান জাতীয় বেস্টসেলার ও বিগ বুক পুরস্কারজয়ী ঔপন্যাসিক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন
