আইভি রহমান ১৯৪৪ সালের ৭ জুলাই ভৈরবের সম্ভান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জালালউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ। শৈশব থেকেই আইভি রহমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে অধিক সক্রিয় হন বিয়ের পর। ১৯৫৮ সালের ২৭ জুন মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাদের বিয়ের প্রধান সাক্ষী। তারাও আজীবন বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে শত প্রতিকূলতাকে ভেদ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাশে থেকেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আইভি রহমান ও জিল্লুর রহমান একটি ঐতিহাসিক জুটি বা পরিবার হিসেবে খ্যাতিমান। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রগতিশীল সব আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত ছিল এই জুটি। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ পরিবার গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও সম্পর্কিত ছিলেন তারা। আইভি রহমানের বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক শেখ রেহানার শাশুড়ি। সে সূত্রে আইভি রহমান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার খালাশাশুড়ি।
আইভি রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও জয় বাংলা বেতারের পাঠিকা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ফাস্ট এইড প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নারীদের প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি অবদান রেখেছেন মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। ১৯৬৯ সালে মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে আইভি রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও আইভি রহমান অবদান রেখেছেন, নারী জাগরণ ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি পুনর্গঠনে রয়েছে তার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থা ও জাতীয় মহিলা সমবায় সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রিধারী আইভি রহমান লেখালেখিও করেছেন। একটি নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে এ দেশের মানুষ মেনে নেয়নি, তারা মেনে নেয়নি... ঘৃণিত খুনি উন্মুক্ত অস্ত্রধারী এবং তাদের পোষ্যদের উল্লাস।’
আইভি রহমান রাজনীতি করেছেন, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জিল্লুর রহমানের বর্ণাট্য জীবনে কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো ছায়াসঙ্গী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। তাদের দুই কন্যা, তানিয়া বখ্ত ও তনিমা রহমান এবং এক পুত্র নাজমুল হাসান পাপন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী নাজমুল হাসান পাপন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর অ্যাভিনিউর সমাবেশে যোগ দিতে আইভি রহমান ও জিল্লুর রহমান একসঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সমাবেশের প্রধান অতিথি ও আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিনাকে হত্যার জন্য নারকীয় গ্রেনেড হামলা হয়। আল্লাহর অশেষ রহমত ও নেতাকর্মীদের বন্ধনে শেখ হাসিনা রক্ষা পেলেও হতাহত হন অসংখ্য নেতাকর্মী। গুরুতর আহত আইভি রহমানকে প্রথমে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালেও তখন লাশের সারি, হতাহত মানুষের ভিড়।
নাজমুল হাসান পাপন বলেন, “আমার সামনে তখন লাশের স্তূপ, আম্মার কাছে যেতে হলে সেই লাশ ডিঙিয়ে যেতে হবে, উপায় নাই যাওয়ার কোনো। আমি তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আম্মা তুমি চিন্তা কইরো না, আমি চলে আসছি।’ জানি না কেন যেন আম্মা মাথাটা নাড়লেন, তখন বুঝলাম যে উনি বেঁচে আছেন।...আম্মাকে যে একটু দেখবে, সার্জারি করবে, সে রকম একটা ডাক্তারও তখন নাই, সবাইকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দেখতে দেখতে প্রায় তিন ঘণ্টা চলে গেল। আমরা ঠিক করলাম, আম্মাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে।...গেট দিয়ে বের হব, এমন সময় চারদিক থেকে পুলিশের বাধা, কোথায় নাকি যাওয়া যাবে না।...ওরা বলল, ওপরের নির্দেশ, আমরা কোথাও যেতে দিতে পারব না!...একটা পর্যায়ে তারা বলল, আম্মাকে শুধু সিএমএইচে আমরা নিয়ে যেতে পারব, আর কোথাও না।”
সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্হায় আইভি রহমান ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট মৃতু্যবরণ করেন। অকালে অন্যায়ভাবে ঘাতকেরা আইভি রহমানের তাজা প্রাণ কেড়ে নিলেও বাংলার মানুষ আজও মেনে নিতে পারেনি তার অকালমৃত্যু। আন্দোলন-সংগ্রামরত অবস্হায় জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশ ও দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যই তার অধিষ্ঠান। মহীয়সী আইভি রহমানকে শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক :শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

