অগ্নিগিরি ও অসমাপ্ত বিপ্লবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২২, ০৪:২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক বেনেডিক্ট রিচার্ড ও গর্ডন অ্যান্ডারসন তাহার ‘ইমাজিনড কমিউনিটিস’ গ্রন্থে বলিয়াছেন, নূতন রাষ্ট্র গঠনের পর সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ‘ইতিহাসের এক নূতন যুগ’, ‘সূর্যোদয়’ প্রভৃতি উপমা ব্যবহার করিয়া থাকে। এই সকল শব্দের সঙ্গে ‘পুনরুজ্জীবন’, ‘পুনর্জন্ম’ ইত্যাদি প্রতীকী শব্দেরও ব্যবহার করা হইয়া থাকে। ইহা মূলত এমন এক সময়, যখন মানুষের আশা বহুদিকে ছুটিতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে। দূর হইতে যখন আকাশে ধোঁয়া দেখা যায়, তখন সহজেই অনুমান করা যায়, সেইখানে আগুন লাগিয়াছে। একটি ভূখণ্ডে যদি ঘনঘন ভূমিকম্প হয়, তখন ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সেই ভূমির গঠনপ্রক্রিয়া এখনো সুসম্পন্ন হয় নাই। সেই কারণেই সেইখানে স্থিতি আসে নাই, কাঁপিয়া উঠিতেছে সময়ে-অসময়ে।

বিশ্বের বহু স্থানেই ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে নানান রাষ্ট্রের গঠনের ক্ষেত্রেও এই ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ভিতরে ভিতরে ঐ সকল রাষ্ট্র ফুঁসিতে থাকে। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির বৈশিষ্ট্য হইল, উহা বেশির ভাগ শান্ত-চুপচাপ থাকে, কিন্তু যে কোনো সময়, যখন-তখন উহার ভিতর দিয়া তপ্ত লাভার উদ্গিরণ ঘটিতে পারে। যখন অগ্নিগিরি শান্ত চুপচাপ থাকে, তখন বুঝা যায় না যে, উহার ভিতরে এত জ্বলন্ত লাভাস্রোত জমিয়া আছে। কিন্তু যাহারা জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ব্যক্তি—তাহারা জানেন এবং বুঝেন, এই প্রকারের অগ্নিগিরি হইতে হঠাত্ উদ্গিরণ হওয়াটাই প্রকৃত বাস্তবতা। ইহাতে বিস্মিত হইবার কিছু নাই। কিন্তু অনেকেই এই সত্যকে পাশ কাটাইয়া অশান্ত পরিস্থিতির আবোলতাবোল ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাহার কারণ হইল, তাহারা মৌলিক প্রশ্নকে এড়াইয়া যাইতে চাহেন।

ভূরাজনৈতিক কারণেই এই বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রের বদল, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটা ঘটিতে থাকে। অরণ্য জগতের বিচিত্র সকল ঘটনা আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখিতে পাই, যাহার সহিত রূপকার্থে ভূরাজনীতিরও কিছু সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাওয়া যায়। যেমন, কোনো শক্তিশালী সিংহরাজ অন্য সিংহদের পরাজিত করিয়া যখন কোনো সিংহীর দখল নেয়, তখন ঐ সিংহীর আগের সকল শাবককে নিঃশেষ করিয়া দেয়। কারণ, নূতন বিজয়ী সিংহরাজ ন্যূন করিয়া তাহার বংশ বিস্তার করিতে চাহে এবং সাজাইতে চাহে তাহার সীমানা। এই বিশ্বের সীমারেখা আঁকিবার পেনসিল ও ইরেজার পরাশক্তিদের হাতে রহিয়াছে। পরাশক্তিদের বদল ঘটে। সুতরাং নূতন কোনো পরাশক্তি যখন দেখে, আগের পরাশক্তি নিজের সুবিধামতো সীমারেখা আঁকিয়াছে, তখন সেই পরাশক্তি চেষ্টা করে তাহার আয়ত্তে আসা ইরেজার ও পেনসিল দিয়া নূতন করিয়া ভূরাজনৈতিক সীমানা আঁকিতে। আর সেই অঙ্কন ও মোছামুছির মধ্যে পিষ্ট হয় সংশ্লিষ্ট জনপদগুলির আমজনতা। কোথাও কোথাও এই বিষয়টি থাকে অমীমাংসিত। আর সেই আনফিনিশড রেভুলেশন তথা অসমাপ্ত বিপ্লবের রেশ বহু বত্সর ধরিয়া চলিতে পারে।

সুতরাং কেন বারংবার লাভার উদ্গিরণ হয়? সমস্যাটা কোথায়—ইহা বড় প্রশ্ন নহে। বরং প্রশ্ন হইল—এই সমস্যা হইতে কী করিয়া উত্তরণ ঘটিবে? যেই বিপ্লব অসমাপ্ত, যেই আকাশে যেই কৃষ্ণমেঘ জমা রহিয়াছে, তাহা হইতে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি তো হইবেই। যত দিন না সেই মেঘের পুরোপুরি ক্ষয় হইতেছে, তত দিন বৃষ্টির দমক থামিবে না, তত দিন প্রকৃতিও থমথমে থাকিবে। কিন্তু দেখা যায় যে, এই মৌলিক প্রশ্ন বুঝিয়া বা না বুঝিয়া অনেকেই উলটাপালটা কথার ফুলঝুড়ি ছোটান। ইহা অজ্ঞতার সমতুল্য। অসমাপ্ত বিপ্লব যেইখানে ঘটিয়াছে, সেইখানে সহিংসতা, হানাহানি, বড় বড় হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান-পালটা-অভ্যুত্থানসহ সকল কিছু মিলাইয়া একটি কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতা তৈরি হইয়া থাকে। ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনো বিশ্বের নানান রাষ্ট্রে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন