সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি 

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২২, ০৩:৫১

দেশে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অপরাধ বেড়েই চলেছে দিনদিন। অনলাইনে পর্নোগ্রাফি, পর্নো ভিডিও, ছবি বিকৃতি, মানসিক হয়রানি ইত্যাদির শিকার হচ্ছে নারী-পুরুষ এমনকি শিশুরাও। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর অধীন এই অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশে বিভাগীয় শহরে আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল সাইবার অপরাধের বিচারকার্য সম্পাদন করে আসছে। আইডি হ্যাকিংয়ের শিকার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের মামলা হলেও তাকে নির্দোষ প্রমাণ করা যায়।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে সর্বসাধারণের জন্য ইন্টারনেট চালুর পর থেকে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিতে পৌঁছেছে। অপরাধীরা এই ইন্টারনেট ব্যবহার করে কম্পিউটার, মোবাইল বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমে যেসব অপরাধ ঘটিয়ে থাকে তাকে সাধারণত সাইবার অপরাধ বলে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে হ্যাকাররা মানুষের ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে নানা অপকর্ম করছে। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাক্ত মাদক, ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কম্পিউটার ভাইরাস। এমনকি ইকমার্সের নামে ভুয়া পেজ খুলে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হচ্ছে অহরহ। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার ওয়েব সাইট হ্যাক, ক্রেডিট কার্ডের নম্বর চুরি, জাল সার্টিফিকেট তৈরি, জাল টাকা বা ভেজাল পাসপোর্ট, বিভিন্ন প্রকার দলিল-দস্তাবেজ কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরির ঘটনাও উদ্ঘাটিত হচ্ছে।

সাইবার অপরাধের মধ্যে আরো রয়েছে তথ্য চুরি, তথ্য বিকৃতি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, অর্থ চুরি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে নেটে প্রচার, রাষ্ট্রবিরোধী তত্পরতা নেটে প্রচার, মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ইত্যাদি। এ ছাড়া সোশ্যাল হ্যারেজমেন্টের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট প্রচার, অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ছবি বিকৃতি করে অপপ্রচার, মানসিক হয়রানি, যৌন হয়রানি, সম্মানহানির জন্য অনলাইনে ও ফোনে হুমকি ইত্যাদি সাইবার বুলিং নামে পরিচিত। এই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক নারী আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথ বেছে নিয়েছেন। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৯০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩০ বছরের নারী। সাইবার বুলিংয়ের শিকার ভুক্তভোগীরা সামাজিক মানমর্যাদা রাখতে ও লোকলজ্জার ভয়ে মুখ না খুলে সাইবার অপরাধের হয়রানির বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে কোথাও অভিযোগ করেন না। যার ফলে অপরাধের মাত্রা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও সাইবার হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ আইনের আশ্রয়ে গ্রহণ করে বিচার পেলেও ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশই আইনের আশ্রয় নেয় না।

আমাদের জানা দরকার—কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে তিনি কীভাবে মামলা দায়ের করবেন। কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাইবার হামলার শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে হয়রানির বিষয়গুলো স্ক্রিন শট দিয়ে রাখতে হবে, ওয়েবসাইট ও পেজের ইউআরএলগুলো সংরক্ষণ এবং ছবি ও ভিডিওগুলো সংগ্রহ করে রাখতে হবে। তারপর মামলার প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে দুইভাবে সাইবার অপরাধের মামলা দায়ের করা যায়—এক. বিজ্ঞ সাইবার ট্রাইব্যুনালের পিটিশনের মাধ্যমে এবং দুই. থানায় এজাহার দাখিলের মাধ্যমে। যদি থানায় সাইবার অপরাধের মামলা থানা না নেয় তাহলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে পিটিশন মামলা দায়ের করা যায়। অপরাধী যদি হয়রানিমূলক তথ্য মুছেও ফেলে, তাহলেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের মাধ্যমে হয়রানিমূলক তথ্য অনুসন্ধান করা সম্ভব।

সাইবার অপরাধের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অধীনে উল্লেখযোগ্য দণ্ডসমূহ হলো : ক. কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদি প্রবেশের দণ্ড হিসেবে ১৮ (৩) অধীনে অপরাধের জন্য আমাদের তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। খ. মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা প্রচারের দণ্ড হিসেবে ২১ (২) ধারার অধীনে আমাদের ১০ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। গ. পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণার অপরাধে ২৪ (২) ধারা অধীন পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ৫ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। ঘ. আক্রমণাত্মক মিথ্যা বা ভীতিপ্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশের অপরাধে ২৫ (২) ধারা মোতাবেক তিন বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। ঙ. সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংগঠনের অপরাধে ২৭ (২) ধারা মোতাবেক অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

চ. ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের অপরাধে ২৮ (২) ধারা মোতাবেক অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লাখ টাকা দণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। ছ. মানহানি কর তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের দণ্ড হিসেবে ২৯ (১) ধারা মোতাবেক দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা অনুযায়ী তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। জ. আইনানুগ কতৃ‌র্ত্ব বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের অপরাধে ৩০ (২) ধারা মোতাবেক পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। ঝ. হ্যাকিং-সংক্রান্ত অপরাধের দণ্ড হিসেবে ৩৪ (১) ধারা অনুযায়ী অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির আইডি হ্যাক করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর ফলে মামলায় ফেঁসে যাতে পারেন নির্দোষ ব্যক্তিরা। এর থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই নেট ব্যবহারকারীকে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে, অজানা ওয়েবসাইটে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে, ডিভাইস থেকে অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ডিলিট করতে হবে ও অচেনা উৎস থেকে কোনো কিছু ডাউনলোড করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও সাইবার অপরাধের মামলায় আসামি হলে আতঙ্কিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে হ্যাকিংয়ের শিকার ভিকটিমদের বিরুদ্ধে মামলা হলে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা জরুরি। ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের সহায়তায় হ্যাকিং হওয়া প্রমাণ করা সম্ভব। এভাবে নিরপরাধ ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণ করা যায়।

লেখক : ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী

ইত্তেফাক/ইআ