কোনো নাগরিক মোবাইল ফোনের একটি সিম নিবন্ধন করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই অন্যের অপরাধ সংঘটন সহজ করে দিচ্ছে কিনা, তা সে নিজেই জানে না। একটি এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একাধিক সিম ব্যবহারের বিধান চালুর সময়ই এ প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২০টি সিম গ্রাহকপ্রতি রাখা যাবে বলে বিটিআরসি সীমা বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু গত ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তা আরো কমিয়ে পাঁচটি করা হয়েছিল। এরপর ঐ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে গত ২০১৭ সালে গ্রাহকপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫টি সিম বা রিম রাখার সুযোগ দেয় বিটিআরসি।
বর্তমানে বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সক্রিয় সিমের সংখ্যা রয়েছে ১৪ কোটি ৩১ লাখ। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের সাইবার অপরাধ তদন্ত বিভাগের অনুসন্ধান সূত্রে দেখা যাচ্ছে নিবন্ধনকারী নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটিমাত্র সিম ব্যবহার করলেও তার অজান্তেই একই এনআইডি দিয়ে সক্রিয় রয়েছে একাধিক মোবাইল সিম। এসব সিম ব্যবহার করে সংঘটিত হচ্ছে নানা প্রতারণা, হুমকি ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা কিংবা অর্থ পাচারের মতো অঘটন। বর্তমানে রোগিঙ্গাদের হাতেও সিম কার্ড। কীভাবে পাচ্ছে? কারা দিচ্ছে? সাধারণত কোনো বাঙালি সিম নিবন্ধনের জন্য গেলে দোকানদার তাকে দিয়ে অজান্তে অন্য আরেকটি সিম নিবন্ধন করছে। বর্তমানে বাংলায় অনেক জায়গায় রেজিস্ট্রেশন করানো সিম পাওয়া যাচ্ছে। আমরা মনে করি, এভাবে ছোট অসতর্কতায় বড় অপরাধের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। এতে করে নিছক ব্যক্তির হয়রানি ও বিড়ম্বনাই নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও সৃষ্টি হচ্ছে সামষ্টিক ঝুঁকি। বিশেষত মোবাইল ব্যাংকিংসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া যখন নাগরিকের ‘হাতের মুঠোয়’ চলে আসছে, তখন এ ধরনের ঝুঁকি সার্বিক ডিজিটালাইজেশনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
এখন মনোযোগ দিতে হবে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দিকে। এক্ষেত্রে প্রথমেই নজর দিতে হবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সংরক্ষিত রাখার দিকে। আমাদের মনে আছে, ২০১৬ সালে দেশের সক্রিয় সব সিমের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল। আমাদের এ-ও মনে আছে, ঐ বছর জুলাই মাসেই কয়েকজন ‘খুচরা’ সিম বিক্রেতাকে আটক করা হয়েছিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের জালিয়াতির কারণে। বিপুলসংখ্যক সিম সীমিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করতে গিয়ে নিরাপত্তা ও সতর্কতার বিষয়টিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। বিষয়টি এখনো আমলে নেওয়া যেতে পারে বৈকি। এ ধরনের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে যে কোনো মূল্যেই। সেক্ষেত্রে মোবাইল কোম্পানিগুলোকেও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে জোর দিতে হবে জনসচেতনতার দিকে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সচেতন নাগরিকই যে উত্তম প্রহরী, এই আপ্তবাক্য অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মোবাইল ফোন বা সিমের মাধ্যমে প্রতারণা জালিয়াতির মাধ্যম হিসেবে অজ্ঞাতসারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে প্রান্তিক মানুষেরাই। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, বিশ্বে যেখানে বেশির ভাগ সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিচ্যুতির কারণে, সেখানে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মূল কারণ জনঅসচেতনতা। এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্ভেদ্য।
দেশের কিছু মোবাইল রিচার্জের দোকানে অবৈধভাবে মোবাইলের সিম বেচাকেনার কর্মকাণ্ড সংঘঠিত হয়ে থাকে। গত অর্ধযুগে দেশের বিভিন্ন থানায় কমবেশি ৪ হাজার সাইবার অপরাধের অভিযোগও এ ধরনের অপরাধের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি প্রমাণ করে। অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ দমনে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও দক্ষ হয়েছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে অসচেতনতার কারণে সংঘটিত অপরাধ দমন করে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যাবে না। কে না জানে যে, রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। সেই কাজটি সিম নিবন্ধন জালিয়াতি বন্ধের মধ্য দিয়েই সূচিত হোক। যে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিম নিবন্ধনে জালিয়াতি চলে, সেটাও আরো সুরক্ষিত করা যায় কীভাবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ওমরগণি এম ই এস কলেজ, চট্টগ্রাম
