উন্নয়নশীল বিশ্বে দেশ পরিচালনা করা সহজ নহে

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২২, ০৮:০১

বাবা-মাসহ পরিবার-পরিজনকে হত্যা করা এমনকি তাহাকেও বারংবার হত্যার চেষ্টা করিবার গুরুতর অভিযোগ রহিয়াছে যাহাদের বিরুদ্ধে, তাহাদের সহিত আলাপ-আলোচনায় কীভাবে বসা যায়? এই প্রশ্নটি বড়ই কঠিন। আবার কেহ যদি এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরও নিন্দা না জানায় এবং মানবাধিকারের কথা বলে, তখনো প্রশ্ন উঠে, সেই সময় তাহারা কোথায় ছিলেন? যখন সেই খুনিদেরই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখনো এই প্রশ্ন উঠা যে অযৌক্তিক নহে তাহা যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করিবেন।

গত ১০-১৫ বৎসর ধরিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ্যে বলা হইতেছে যে, বাবা মাসহ পরিবার-পরিজনকে হত্যা করা হইলেও তাহার বিচার পাওয়া যায় নাই। উলটা মামলা করা যাইবে না বলিয়া ইনডেমনিটি জারি করা হয় সেই সময়। তবে আল্লাহরও যে বিচার রহিয়াছে তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের ইহা এক মহা সমস্যা। এই সকল দেশে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে শাসকদের হত্যা করা হইলেও তাহার সুবিচার মিলিতেছে না শীঘ্র। বিচার ও এই সংক্রান্ত প্রশ্নের সুরাহা না হওয়ায় একের পর এক রাজনৈতিক খুনখারাবি, রেষারেষি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি লাগিয়াই আছে। ফলে যিনিই আসেন ক্ষমতায়, তাহার পক্ষে দেশ পরিচালনা করা কঠিন হইয়া পড়ে। মোকাবিলা করিতে হয় নানা কণ্টাকীর্ণ পথ। দেশপরিচালকগণ যদি এইভাবে সর্বক্ষণ দুঃখবোধ দ্বারা তাড়িত হইতে থাকেন, তাহা হইলে দেশের টিকসই উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব? এই জন্য এই সকল দেশে অনেক সময় মন্ত্রীর চাইতে সচিবরা পাওয়ারফুল বা ক্ষমতাবান হইয়া উঠেন। আইনের মধ্যে থাকিয়া সকলে কাজ করিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হইবার কথা ছিল না। 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু লইয়া যে প্রশ্ন উঠে, আমরা সচরাচর তাহার সমাধান হইতে দেখি না বলিয়াই অস্থিরতা চলিতেই থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল বা কংগ্রেস ভবনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা হামলা করায় এই লইয়া মামলা করিয়াছেন খোদ সেখানকার বিচার বিভাগ। আইনকানুনের ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হইলে কাহারও কোনো দুঃখবোধ থাকিবার কথা নহে। ইহাতে কোনো প্রশ্ন জওয়াবহীন থাকিবে না, কোনো ইস্যু থাকিবে না অমীমাংসিত। উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষ রাস্তাঘাটে হাঁটিয়া বেড়ায় বটে, কিন্তু শুধু তাহার দেহটাই আছে, মনটা যেন বড়ই ফাঁকা। এই কারণে সে সকল কিছু স্বাধীনভাবে ভাবিতে পারে না, চুলচেরা বিশ্লেষণ করিতে পারে না। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসাবে খ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লেবাননের রাজধানী বৈরুতে মারা গেলেন রহস্যজনকভাবে। তাহার মৃত্যুও আমাদের সম্মুখে একটা বড় প্রশ্ন রাখিয়া গিয়াছে, যাহা আজও অমীমাংসিত। এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকিলে মানুষের খেদ থাকিয়া যাওয়াটাই স্বাভাবিক। উন্নয়নশীল বিশ্বে এই রকম অমীমাংসিত ইস্যুগুলির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনা নাই। এই ইস্যুগুলির সঙ্গে অনেক সময় আদর্শের বিষয়ও জড়িত থাকে। কিন্তু তাহার ব্যাখ্যা ও সমাধানে যুগোপযোগী দার্শনিক ভিত্তি গড়িয়া উঠিতেছে না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ করা হইল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে পিছনে ফেলিয়া আসা হইল কেন? কেন ১২০০ মাইল দূরবর্তী একটি অঞ্চলকে জুড়িয়া দেওয়া হইল সেই নবগঠিত রাষ্ট্রের সঙ্গে? কেন লাহোর প্রস্তাবের ব্যত্যয় হইল এবং গড়িয়া উঠিল না একাধিক রাষ্ট্র? এই সকল প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়ায় তাহা একসময় যে বিস্ফোরিত হইবে, এই কথা অনেকের অজানা ছিল না।

জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি লইয়াও বিতর্ক দেখা দিয়াছে। অথচ তাহারা জীবিত থাকা অবস্থায় ইহা লইয়া কিছুই বলেন নাই। বাংলাদেশবান্ধব মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলত্জ ঠিকই বলিয়াছেন, ইহা ‘আনফিনিশড রেভু্যলেশন’ অর্থাৎ বিপ্লব এখনো শেষ হয় নাই। তৃতীয় বিশ্বে এইভাবে একের পর এক বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব চলিতে থাকায় এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ও শান্তিতে দেশ পরিচালনা করা উভয়ই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। অবশ্য সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। কিন্তু এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যাহাকে কার্পেটের নিচে ফেলিয়া রাখা যায় না। এই সকল ইস্যু ধামাচাপা দেওয়ার কারণে উন্নয়নশীল বিশ্ব সামনে অগ্রসর হইতে পারিতেছে না।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন