১৯৪৫ সালে সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রথম বারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ নামক দুটি পারমাণবিক বোমার আঘাতে এই অঞ্চলদ্বয়ে নিহত হয় ৩ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা বিশ্বে এটিই প্রথম।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক অস্ত্র ‘দুটি’ থেকে বেড়ে আজ কয়েক হাজারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত বিভিন্ন পরিস্থিতিকে যে কঠিন করে তুলছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্বব্যাপী এখন হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে যদিও; তবে এই সংখ্যা ১৯৮৫ সালে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালের ৬৩ হাজারের বেশি অস্ত্রের এক-চতুর্থাংশেরও কম। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালে জাতিসংঘে যা বলেছিলেন, তা এখনো আগের মতোই জরুরি বার্তা। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা নিয়ে তিনি সে সময় উচ্চারণ করেছিলেন এক বিশেষ উক্তি—‘আমাদের নিঃশেষ করার আগেই এই অস্ত্রগুলো আমাদেরই ধ্বংস করে দিতে হবে।’
পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই ‘নিউক্লিয়ার প্রলিফারেশন ট্রিটিতে (পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসংক্রান্ত চুক্তি)’ স্বাক্ষর করা শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র। ১৯৭০ সালে চুক্তিটি কার্যকর করা হয়। এই ট্রিটিকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘এনপিটি’। কার্যকরের শুরু থেকেই তথা বিগত অর্ধশতক কালের বেশি সময় ধরে চুক্তিটি পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাসের পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর ওপরও একধরনের ‘ঢাকনা’ রাখতে অবদান রেখে চলেছে চুক্তিটি, যাতে করে দেশগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ার সুযোগ না পায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অন্য যেকোনো অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা কিংবা নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির চেয়ে এনপিটি ট্রিটি অনুমোদন করেছে বেশির ভাগ দেশ। অর্থাৎ, বিশ্বের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র যে কী মাত্রায় ঝুঁকি বহন করে, তা প্রতিটি দেশই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনপিটিকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আমাদের সবাইকে সেটিই করা উচিত।
শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার পারদ সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠার পর থেকে আজ অবধি পারমাণবিক বিপর্যয়ের প্রশ্নে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্ব। যে কোনো সময়ের চেয়ে আজকের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বিগত দুই দশকের ‘স্হবির অবস্হা’ পারমাণবিক ঝুঁকিকে কঠিন বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
বর্তমানে ১৯১টি দেশ এনপিটি নবায়ন করার জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কাজ করছে। আলোচনার অগ্রগতি হচ্ছে বটে, তবে মনে রাখতে হবে, এই আলোচনা এমন একটি সময়ে সংঘটিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের মানুষের জন্য এটি যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।
কোনোভাবেই এই সত্যকে উপেক্ষা করা যাবে না যে, পারমাণবিক বিপর্যয় সমগ্র বিশ্বের জন্য শুধু ‘বিশাল’ হুমকিই নয়; বরং তা ক্রমাগতভাবে বিশ্বব্যাপী ‘বড় ঝুঁকি’ তৈরি করেই চলেছে। যেমনটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বলতে শোনা গেছে, ‘কোনো সংঘাতের সময় অথবা চরম উত্তেজনা বিরাজকালে ‘পরিস্হিতির ভুল গণনার দ্বারা চালিত হয়ে ভুল করে’ পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা যেতে পারে।
এই অবস্হায় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে পারমাণবিক অতল গহ্বর থেকে সরে আসতে আহ্বান জানাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। এবং একটি নতুন বহুপাক্ষিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানাচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ভৌগোলিক অবস্হানে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু তার পরও নিউজিল্যান্ড কেন এই সমস্যা সম্পর্কে এত উচ্চ স্বরে কথা বলছে? এই প্রশ্নের উত্তর বেশ সোজা। এটা সবার জনা যে, আমরা একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় জাতি। কয়েক দশকের পারমাণবিক পরীক্ষার ‘ক্ষতচিহ্ন’ বহন করে চলেছে আমাদের এই অঞ্চল। এই অঞ্চলের মানুষ এবং ভূমি ও জল উভয় ক্ষেত্রেই এই দাগ সুস্পষ্ট। চরম ভীতি ছড়ানোর পাশাপাশি এটি আমাদের জন্য স্বভাবতই একটি উচ্চমাত্রার ঝুঁকি। এ কারণে বিগত ৩৫ বছর ধরে পারমাণবিক শক্তির পথে হাঁটেনি নিউজিল্যান্ড। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ওকালতি করে আসছি আমরা।
এর অর্থ এই নয় যে, আমরা বাস্তব জগতের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারি না। অথবা আমাদের ভৌগোলিক অবস্হানের পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক পরীক্ষা ঘটানো হয় বলে আমরা এটি করছি, যা এরূপ অন্যান্য ভৌগোলিক এলাকার বাসিন্দারা করে না। কিংবা এর অর্থই এই নয় যে, আমাদের কাছে এটি একধরনের ‘বিলাসিতা’। প্রকৃতপক্ষে নিউজিল্যান্ডের বার্তা হলো, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের মুখে আমরা কেউ নিরাপদ নই। একই সঙ্গে বিশ্বের কোনো স্হানই এর ঝুঁকি এড়াতে পারে না। কাজেই এখান থেকে ফেরত আসতে হবে, এটি বন্ধ হওয়াই উচিত’—এরূপ অভিব্যক্তি দেশের অধিকাংশ জনগণের। এই অবস্হায় নিউজিল্যান্ডের বক্তব্য হলো, ‘আমাদের শুধু এটি বিশ্বাস করতে হবে যে, এটি থামাতে একটি ভিন্ন উপায় খঁুজে বের করা, অর্থাত্ নতুন কোনো কার্যকর ব্যবস্হার অবতারণা করা অবশ্যই সম্ভব।’
একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে আমদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখা দরকার আমাদের। হিরোশিমা ও নাগাসাকি আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছে, সেই বিভীষিকাময় ঘটনার শিক্ষা অনুধাবন করতে হবে। এবং এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পরিচালিত পরীক্ষাগুলো এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন ‘ঝুঁকি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বহুপাক্ষিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হওয়ার চ্যালেঞ্জগুলো দুরূহ বলে মনে হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এটি এমন কোনো কাজ নয়, যা অনির্দিষ্টকাল ধরে ফেলে রাখতে হবে।
এই মুহূর্তে চুক্তটি বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য বটে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে। আরো গভীরভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ শর্তগুলো পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করার প্রশ্নে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংশয় ও হতাশা কাজ করে। রাষ্ট্রগুলোর যুক্তি হলো, বৈশ্বিক নিরাপত্তার পরিবেশ এটিকে যথেষ্ট কঠিন করে তুলবে।
কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে চুক্তির প্রতি দেশগুলোর বিশ্বাস হারানোর একটি বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অগ্রগতি ও পারমাণবিক অস্ত্রসামগ্রীর বিস্তার রোধ—উভয়কেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
এই অবস্হায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কিছু করার আছে। কেউ কেউ বলতে পারেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্হিতি যে অবস্হায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এবং একই সঙ্গে এটি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও এর বিস্তার রোধের প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ² করছে।’ কিন্তু তাদের সঙ্গে আমি একমত নই কোনোভাবেই। আমি এমন একটি যুক্তি মেনে নিতে পারি না, যা নিরাপত্তা ও অস্হিতিশীলতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে আমাদের কাজটি করতে বাধাগ্রস্ত করে। এমন দাবি আমার কাছে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য হবে, যা বিশ্বকে নিরাপদ ও স্হিতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বস্ত্তত এমন সব ধারণা চুক্তির ইতিহাসকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করে—এনপিটি বাস্তবায়নের লম্বা ইতিহাস এই শিক্ষা দেয় যে, বহুপাক্ষিক যুক্তিও অস্বাভাবিক নয় কোনোভাবেই।
ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ থাকতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে একটি ‘সাহসী নেতৃত্ব’। পারমাণবিক স্তূপের শীর্ষ চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা—এই ঝুঁকির বিষয় সামনে রেখে এর বিরুদ্ধে ‘বিশ্ব স্বীকৃতি’ আদায় অত্যন্ত জরুরি। এবং সর্বোপরি জরুরি হলো বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে মুক্ত করার জন্য গৃহীত প্রচেষ্টাগুলোর ধারাবাহিক অগ্রগতি। ভুলে গেলে চলবে না, ‘এটি কেবল সম্ভবই নয়, অতি জরুরি।’
লেখক: নিউজিল্যান্ডের প্র্রধানমন্ত্রী
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃত্ খান সুজন
