প্রকৃতি মানবজাতির জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার এক অসীম নিয়ামত। প্রকৃতির বন ও জীববৈচিত্র্য মানুষের নান্দনিক প্রয়োজন মেটায়। ভাওয়াল ও মধুপুরের উঁচু উঁচু টিলায় গজারিগাছ এখনো নির্মল শীতল পরিবেশ টিকিয়ে রেখেছে। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা পরিবেশবান্ধব গজারি বনের মনকাড়া সৌন্দর্য কাছে টানে। মজবুত ও ভারবাহী গজারিগাছ কেটে ফেললেও শিকড় থেকে পুনরায় চারা জন্মায়। বসন্তে পাখাযুক্ত ফলগুলো উড়ে উড়ে দূরে যেয়ে আপনাআপনি নতুন বনের সৃষ্টি করে।
বসন্তকালে গজারি বনের সম্পূর্ণ পাতা ঝরে যায়। তখন স্হানীয় মানুষ বন পুড়িয়ে আনন্দ পায়। চারা গাছগুলো মরে গেলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। নিয়মিত কপিচ (ছোট চারা) কাটার পর নতুন করে গজারির জন্ম হয় না। মানুষের অত্যাচারে গজারি বন ধ্বংস হতে চলেছে। ভূমি দখল ও গজারিগাছ নিধনের ফলে ক্রমাগত বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের। একসময় গজারি বনে সোনালু, পলাশ, কড়ই, গাদিলা, বহেরা, হিজল, বট, হরিতকী, অজুর্ন, ছাগলনাদি ইত্যাদি গাছ ছিল। আমলকি, আজুগি, জয়নাগোটা, আনাইগোটা, চুকাইগোটা, তিতিজাম, বন আমড়া, বংকই, চিনাইগোটা, বরই ও খেজুরসহ লতা জাতীয় প্রচুর ফল পশুপাখিদের খাবার ছিল। কচু, ঘেচু, গইচাআলুসহ বিভিন্ন বনআলু শূকর, সজারু ও বানরসহ অন্যান্য প্রাণীর খাবার ছিল।
গজারি বন থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে চিতাবাঘ, হরিণ, বন মোরগ, ময়ূর, হনুমান, খরগোশ ও অজগরসহ অনেক প্রজাতির পাখি। পাহাড়ের ঝরনা, বাইদের স্বচ্ছ পানির জলাধার এখন আর নেই। বর্তমানে শিয়াল, বানর, বেজি, গুইসাপ ও পাখিরা খাবারের অভাবে লোকালয়ে চলে আসছে। বনে প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ না থাকায় বিলুপ্ত হচ্ছে অন্য প্রাণীও। গজারি বন ধ্বংস করে কৃত্রিম বন সৃষ্টির কারণেই পরিবেশের এমন বিপর্যয় ঘটছে। বাস্ত্তসংস্হান ও খাদ্যশৃঙ্গলের কথা না-ভেবেই গজারি গাছ কেটে কৃত্রিম বন তৈরি হচ্ছে। সমাজিক বনায়নে উত্সাহ দিয়ে সুবিধাভোগীদের মধ্যে জমি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এই সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা অসহায় ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই বেশি জমি বরাদ্দ পাচ্ছে।
জমি বরাদ্দ পেয়েই সুবিধাভোগীরা লাভবান হওয়ার জন্য গজারিগাছ কেটে আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস ইত্যদি পরিবেশদূষণকারী গাছের বাগান করছে। আকাশমনি গাছের পাতা এতটাই বিষাক্ত যে এই গাছের নিচে কোনো ঘাস ও লতা জাতীয় গাছ জন্মায় না। ইউক্যালিপটাস গাছ অতিমাত্রার পানি শোষণ করে। আকাশমনির ফুল চর্মরোগ সৃষ্টি করে, স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অপরিকল্পিতভাবে বনায়নে পরিবেশদূষণকারী গাছের দাপটে গজারি বন ধ্বংস হচ্ছে। গজারি প্রকাশ্যে বাজারে বিক্রি হয় না বলেই এ গাছ গোপনে কেটে ফেলে।
গজারি বনের সহযোগী প্রাকৃতিক উদ্ভিদগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস হয়েছে বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদাসীনতায়। তাঁরা শুধু গজারিগাছকেই বেশি গুরুত্ব দেন। আকাঠা হিসেবে অন্যান্য কাঠ কেটে নিলে বনবিভাগের লোকজন দেখেও না দেখার ভান করে। সুযোগ পেয়ে স্হানীয় লোকজন গজারির সহযোগী উদ্ভিদ কেটে নিয়ে যায়। বর্তমানে বন বিভাগ গজারিগাছের ফাঁকে ফাঁকে অন্য প্রজাতির গাছ রোপণ করছে। যত্নের অভাবে শতকরা ৩ থেকে ৪টি গাছ বেঁচে থাকলেও এর অজুহাতে গজারির ছোট ছোট সব চারা কেটে ফেলায় শটি, লতাজাতীয় গাছ, ওষুধি গাছ, বুনোফুল ও বনফল ধ্বংস হচ্ছে। প্রাণীদের আবাসস্হলও নষ্ট করা হচ্ছে। সমাজিক বনায়ন অথবা গজারি বনে অন্য গাছ লাগানো কোনোটাই সুফল বয়ে আনবে না।
পশুপাখি কীটপতঙ্গ, অণুজীব যাতে একত্রে বসবাস করতে পারে তার জন্য গজারি বন বাঁচাতে হবে। সকল জীবই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বাঁচার জন্য জীবদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। কেউ লাভবান হয় আবার কেউ বিলীন হয়। মানবসৃষ্ট কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হোক এটা আমরা চাই না। যেহেতু লতা, গুল্ম, ঘাস, ওষুধি উদ্ভিদ, বনফুল, বনফল ইত্যাদি কৃত্রিম বনে জন্মাতে পারে না; তাই পরিবেশ নষ্টকারী কৃত্রিম বনায়ন বন্ধ হোক। প্রাকৃতিক গজারি বন বাঁচাতে এগিয়ে আসুন।
গাজীপুর
