দূর পাহাড়ের শিশুরা

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২২, ০৪:৩০

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার গুইমারা উপজেলার পাহাড়ি পথ ধরে এগোলেই সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের বাজার। এখান থেকে ঘন সবুজ পাহাড়, নির্জন ও দুর্গম পাহাড়িপথ, আঁকাবাঁকা স্বচ্ছ জলের ঝিরিপথ, বড় বড় পাথর, ২০০ বছর প্রাচীন বটগাছ পেরোলেই চোখের সামনে ধরা দেবে চমত্কার এক গ্রাম ‘আকবাড়ি পাড়া’। পাহাড়ি এই ছোট্ট গ্রামের মিশুক স্বভাবের মানুষগুলো সবাই মারমা গোত্রের। গ্রামের সবাই খুবই সাদাসিধে কিন্তু প্রাকৃতিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এর ছাপ পাওয়া যায় তাদের ঘরবাড়ি, পোশাক, চলাফেরা এবং খাওয়া-দাওয়ায়।

পাহাড়ের কোলে কৃষিকাজ ও মাছ ধরেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে তারা। এই দুর্গম গ্রামে মানুষের মাঝে সুখ-শান্তি সবই আছে, কিন্তু নেই শিশুদের ভালোভাবে গড়ে ওঠার জন্য সাধারণ চাহিদাগুলো। বাচ্চাদের অধিকাংশই অপুষ্টিসহ নানা ধরনের রোগে ভুগে থাকে। এরা ঠিকভাবে ভিটামিন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ভ্যাকসিন বা টিকাও পায় না। ফলে অনেক শিশুই নিয়মিত ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হাম, বসন্ত, প্রদাহ, জীবাণুঘটিত ফ্লু, ত্বকের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। চিকিত্সার জন্য শিশুদের দুর্গম এবং বিপদসংকুল পাহড়ি ও ঝিরি পথ পেরিয়ে বহু দূরের স্বাস্হ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়। পাহাড়ে বসবাস করা এই শিশুরা সার্বিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। 

আকবাড়ি পাড়া গ্রামের শিশুরা পাহাড়ি ছড়ার পানি পান করে। একটি নলকূপ থাকলেও তা পুরো গ্রামের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র। এছাড়া নেই স্যানিটেশনব্যবস্হা। তাদের বিশ্বাস ঝাড়ফুঁকে রোগ ভালো হয়ে যায়। অসুখের তীব্রতায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। গ্রাম থেকে অনেক দূরে গিয়ে চিকিত্সা করার ফলে অনেক শিশুর সাধারণ রোগেই অকালমৃত্যুও ঘটে। কয়েকবছর আগেও ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার জন্য কোনো স্কুল। কেউ পড়ালেখা করতে চাইলে তাকে প্রতিদিন বহু দূরের স্কুলে যেতে হতো, যা বাচ্চাদের জন্য ছিল কষ্টকর। কোমলমতি বাচ্চাদের এই কষ্ট দেখে স্হানীয় কিছু উদ্যমী ও স্বপ্নবাজ তরুণ অল্প অল্প করে স্বপ্ন বুনতে থাকে আকবাড়ি পাড়ায় একটি স্কুলের জন্য। আর এজন্য অনেক কাঠখড়ও পোড়াতে হয় তাদের।

একসময় তাদের একাগ্রতা এবং সহানুভূতিশীল কিছু মানুষের সহায়তায় দাঁড়িয়ে যায় ‘আকবাড়ি পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পাহাড়ের কোলে স্হাপিত এই স্কুলের শরীরজুড়ে দেখা যায় চিরসবুজ বাংলাদেশ ও পাহাড়ি রঙ। আস্তে আস্তে স্কুলের বাচ্চাদের পোশাক, বই-খাতা, টেবিল-চেয়ারও জোগাড় হয়। এমনকি সোলার প্যানেল দিয়ে হয় বিদ্যুতের ব্যবস্হাও। তবে ব্যক্তি উদ্যেগে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলের ব্যবস্হাপনা প্রায়ই থমকে যায় নিয়মিত সাহাঘ্যের অভাবে। 

খাদ্য সংস্হানের জন্য বাচ্চারা খুব অল্প বয়স থেকে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে জুমচাষসহ নানাবিধ কঠিন পরিশ্রমের কাজে যায়। ফলে তাদের স্কুলে ধরে রাখাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ি গ্রামের শিশুদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি আন্তরিকতা, পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ব্যবস্হাপনা প্রয়োজন। মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারলে ছবির মতো পাহাড়ি আকবাড়ি পাড়ার শিশুরা রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াতে পারবে। তা দেখে নিশ্চয়ই তৃপ্তি, আনন্দ, গর্ব ও নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে চোখের কোণে জল মুছবেন আকবাড়ি পাড়াগ্রামের বৃদ্ধ মারমারা।

ঢাকা 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন