মিয়ানমারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। সেখানে নতুন শহর গড়তে অর্থ বিনিয়োগ করেছে এই চক্র। গড়ে তুলছে ক্যাসিনো। মিয়ানমার সেনার বিরুদ্ধে লড়তে অর্থ, অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে সেখানকার আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে। ফলে মিয়ানমার সেনার সঙ্গে আঞ্চলিক সশস্ত্র বাহিনীর সংঘর্ষ বাড়ছে। স্হবির হয়েছে শান্তিচুক্তি। পাশাপাশি মিয়ানমারে বেড়ে চলেছে জুয়া, মুদ্রা পাচার, ক্রিপটো কারেন্সির ব্যবসায়ও, যা ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এই অপরাধ চক্রের নেপথ্যে রয়েছে ম্যাকাওয়ের কুখ্যাত মাফিয়া ওয়াং কুওক কুই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্ধকার জগতে তার পরিচিতি ‘ব্রোকেন টুথ কুই’ নামে। আন্তর্জাতিক এই চক্রে রয়েছে ১৪ হাজার মাফিয়া এবং আরো ৬ হাজার দুষ্কৃতী। এদের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে। বিভিন্ন দেশে অবস্হান করা চীনা নাগরিকদের ব্যবহার করে এরা এই চক্র চালাচ্ছে। হেরোইন থেকে শুরু করে আদম পাচার, চাঁদাবাজি, বেআইনি জুয়া চক্র চালানোয় এরা সিদ্ধহস্ত।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় আদম শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের পেছনেও এই গোষ্ঠীর যোগ পাওয়া গেছে। একটি খুনের ঘটনায় ১৩ বছর জেলে থাকার পর ২০১২ সালে মুক্ত হয়ে ওয়াং কম্বোডিয়ায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা গড়ে তোলে। অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তারে নিজস্ব ক্রিপটো কারেন্সি ‘ট্রায়াড কয়েন’ বাজারে এনেছে। ওয়াং এখন ডংমেই গ্রুপের প্রধান। মিয়ানমারের কেরানের ইয়েতাই শহরে ‘শোয়েকোকো’ প্রকল্প হচ্ছে। তিনটি প্রকল্পে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে, যা ১০ গুণ লাভজনক হয়ে উঠবে ২০২৭ সাল নাগাদ। এই সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংস্হাগুলি স্হানীয় কিছু সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা নিচ্ছে। সংস্হাগুলির দাবি, তারা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সঙ্গে যুক্ত।
হংকংয়ে নথিবদ্ধ ইয়েতাই ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং গ্রুপের সঙ্গে কেরান বর্ডার গার্ড ফোর্সের ২০১৭ সালে ইয়েতাই নিউ সিটি প্রজেক্ট গড়তে চুক্তি হয়েছিল। নেপথ্যে ছিল মিয়ানমারের জাতীয় সশস্ত্র বাহিনী। ইয়েতাই ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং গ্রুপের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যশৃঙ্খল রয়েছে। শোয়েকোকো শহরে ক্যাসিনো চালানোর অনুমোদন রয়েছে। এই বিনিয়োগ বেসরকারি চীনা সংস্হার বলা হলেও এর মধ্যে অপরাধ জগতের টাকা রয়েছে। পাশাপাশি কেরানে হচ্ছে হনইয়া ইন্টারন্যাশনাল সিটি প্রজেক্ট। কেরান ন্যাশনাল ইউনিয়নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য এবং কেএনইউ সেনা দপ্তরের প্রধান রজার কিন এর সঙ্গে জড়িত। প্রকল্পে চীনা বেসরকারি সংস্হার বিনিয়োগ থাকলেও কেএনইউ এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। শোয়েকোকো প্রকল্পের মূল বিনিয়োগকারী ঐ শহরটিকে ইতিমধ্যেই নিজের বলে দাবি করছেন এবং মিয়ানমার সরকারকে এড়িয়ে চলছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন কিছু বিনিয়োগকারীর অপরাধ জগতের যোগ থাকাটা কেএনইউর পক্ষে বুঝে ওঠা কঠিন।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সংক্ষিপ্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। বেআইনি জুয়া এবং তার কারণে তৈরি হওয়া সম্পদ কম্বোডিয়ার শিহানুকভিলের বাসিন্দাদের শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানকার বাসিন্দাদের ঠেলে দিয়েছে চীনা সংস্কৃতির দিকে। সেখানে কাজ পাওয়ার চাবিকাঠি চীনা ভাষা জ্ঞান। সেখানকার ক্যাসিনোগুলি আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা বিভিন্ন সময়ে স্হানীয় পুলিশ এবং নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এভাবে কম্বোডিয়ার আর্থিক স্হিতি ভেঙে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা হারিয়েছে।
১৯৪৯ সাল থেকে মিয়ানমারের কেএনএলএর সেনা বিভাগ কেরান ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরোধ। কেএনএলএর খ্িরষ্টধর্মবলম্বীরা আলাদা সংগঠন গড়েছে। ১৯৯৪ সালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গড়ে তুলেছে ডেমোক্রেটিক কেরান বুদ্ধিষ্ট আর্মি (ডিকেবিএ)। ২০০৯ সালে মিয়ানমার সেনা জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীগুলিকে একটি বর্ডার গার্ড ফোর্সে অন্তভুর্ক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাহিনীগুলিকে নিজেদের এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও ভাবা হয়। ডিকেবিএর একটি অংশ জেনারেল স চিট থু-এর নেতৃত্বে কেরান বর্ডার গার্ডের অন্তভুর্ক্ত হয়। উল্লেখ্য, এই বাহিনী অতীতে কেরান এবং মন প্রদেশে জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীগুলির ওপর হামলা সংগঠিত করেছিল। ২০১৫ সালে কেরান ন্যাশনাল ইউনিয়ন মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করে। যদিও সেই শান্িতচুক্তি স্হবির হয়ে গেছে। কেএনএর নেতারা এখন স্বায়ত্তশাসনের জন্য ভিন্ন পম্হা অবলম্বন করছে। তাদের সঙ্গে মিয়ানমার সেনা এবং বর্ডার গার্ড ফোর্সের মাঝেমধ্যেই সংঘাতের ঘটনা ঘটছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গ্রেফতারির প্রতিবাদে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেরান প্রদেশের লে কে কাও নতুন শহরের কাছে মিয়ানমার সেনা এবং কেএনএলএর সংঘর্ষ হয়। দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালের জুন মাসের পর থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি কেএনএলএর মিয়ানমারের সেনাদের ওপর হামলা বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে ২৬ জন সেনার মৃতু্য হয়েছে। জখম হয়েছেন ৩৫ জন। ঐ বছরের জুলাইয়ের ১৫ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে কেরান প্রদেশে ২৯টি এ রকম হামলার ঘটনা ঘটে। মিয়ানমারে যেসব চীনা বিনিয়োগ হয়েছে সেগুলির বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই সে দেশের সরকারের বিনিয়োগ কমিশনের অনুমোদন নেই। অভিযোগ উঠছে মিয়ানমারকে পরিকল্পিতভাবে মাফিয়াদের কলোনিতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্হাগুলি দাবি করছে, তারা চীনের বেল অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ছত্রছায়ায় রয়েছে। এভাবেই সংস্হাগুলো চীন সরকারকে মিয়ানমার এবং অন্যত্র খাটো করছে। বিআরআইয়ের দিকে অভিযোগ তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে, চীনের কিছু আধিকারিক হয় তো এভাবে ভারত মহাসাগরের উপকূলে মিয়ানমারে স্হায়ী জটিল অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। মিয়ানমার সেনা তাতমাদুর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য কেরান ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (কেএনএলএ) এবং আরো কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি অস্ত্র, অর্থ জোগাচ্ছে পিপলস লিবারেশন আর্মি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো মিয়ানমারেও কোভিড কঠিন আর্থিক পরিস্হিতি তৈরি করেছে। এই সুযোগে সেখানে বিনিয়োগ করতে আসা বেসরকারি চীনা সংস্হাগুলি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ক্যাসিনো, আবাসন গড়ে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া মিয়ানমার সরকার এ ধরনের বেআইনি বিনিয়োগ ঠেকাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের সহায়তায় কেরানের সশস্ত্র বাহিনীগুলি আরো শক্তিশালী হলে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলবে। এমনটাও হতে পারে, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাওয়ার পর সেই রাজ্যটি সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানায় চলে যাবে। কারণ তাদের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থাকছে বিদেশি সংস্হার হাতে। তখন কিন্তু নতুন ধরনের মতভেদ এবং সংঘর্ষের পরিস্হিতি তৈরি হবে। মিয়ানমার হয়ে উঠবে ভঙ্গুর একটি দেশ। তখন এক দেশ, দুই প্রশাসন পরিস্হিতি তৈরি হবে।
আঁচ আসবে বাংলাদেশের ওপরেও। রোহিঙ্গা পরিস্হিতি যেমন জটিল আকার ধারণ করেছে, সেই রকমই বাংলাদেশের জন্য নতুন সমস্যা হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণে মাদক, আদম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চক্র। নতুন পরিস্হিতির কারণে যদি নতুন করে মিয়ানমারের বাসিন্দারা বাংলাদেশমুখী হতে শুরু করে, তা আরো কঠিন পরিস্হিতি তৈরি করবে।
লেখক: ইত্তেফাকের কলকাতা প্রতিনিধি
