অস্তিত্বসংকটের মুখে মানুষ?

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২২, ০৭:০০

জ্ঞানী মানুষেরা নিকট-ভবিষ্যৎ দেখিতে পান, বাস্তবতা উপলব্ধি করিতে পারেন। কিন্তু পৃথিবীর বড়ই দুর্ভাগ্য যে অধিকাংশ মানুষ তাহাদের কথা সময়মতো অনুসরণ করিবার কথা বিবেচনায় রাখে না। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক একজন পরিবেশবিদ। বহু পূর্ব হইতেই তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব লইয়া সোচ্চার রহিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমাদের নিত্যদিনের প্রবণতা হইল, যদি কোনো ঘটনা পূর্বে না ঘটিয়া থাকে তাহা হইলে আমরা মনে করি উহা ঘটিবে না। কিন্তু ব্যতিক্রম মৃত্যু ডাকিয়া আনিতে পারে। সেই রকমই একটি ব্যতিক্রম হইল জলবায়ু পরিবর্তন।’ 

আরো সুস্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন লেখক ও পরিবেশবিষয়ক স্বনামধন্য সাংবাদিক জেফ গুডওয়েল। তিনি বলিয়াছেন, ‘মানুষ কি একটি ব্যাঙের চাইতে খুব বেশি সচেতন? আপনি যদি একটি পাত্রের পানির মধ্যে একটি ব্যাঙ রাখিয়া ধীরে ধীরে পাত্রের নিচে তাপ দিতে থাকেন, তাহা হইলে ব্যাঙ মৃদু উষ্ণতা পাইয়া আরাম অনুভব করিবে। কিন্তু কিছু পরে এমন একটি সময় আসিবে যে ব্যাঙটি আর পাত্র হইতে লাফাইয়া বাহির হইতে পারিবে না। ঐ পানিতেই সিদ্ধ হইয়া মারা পড়িবে। আমরা মনুষ্য সমাজও হুবহু একই কাজ করিতেছি।’ 

শুধু এই দুই জনই নহে, একের পর এক জাতিসংঘের মহাসচিব, অসংখ্য পরিবেশবিদ, পরিবেশ বিজ্ঞানী, পরিবেশবাদী সংগঠন পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যাইতেছে বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে সতর্ক করিয়া আসিতেছেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশ তাহাদের নিজ স্বার্থরক্ষা করিতে গিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্রহণের ডাক উপেক্ষা করিয়া আসিতেছিল। যুক্তরাষ্ট্রেরই বিগত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হইতে সরিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন, ইহা একটি কন্সপিরেসি থিওরি!

ইহা যে কোনো কন্সপিরেসি থিওরি নহে, ইহা যে শুধু একটি অনুমান নহে তাহা বিশ্ব এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করিতেছে। আক্ষরিক অর্থেই চমকাইয়া উঠিবার মতো পরিস্হিতির সম্মুখীন এই মুহূর্তে বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র অধিকাংশ দেশ। বিশ্বব্যাপী খরা, বন্যা, ভূমিধস, দাবানল, নদীর পানি নামিয়া যাওয়া, দাবদাহ—সকল মিলাইয়া এতই তীব্রতা দেখা দিয়াছে, যাহা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়াইয়াছে এবং বিভিন্ন দেশে জলবায়ুজনিত জরুরি অবস্হা ঘোষণা করিতে হইতেছে। ইউরোপে বিগত ৫০০ বত্সরের মধ্যে সবচাইতে তীব্র খরা দেখা দিয়াছে। ইউরোপের ৪৭ শতাংশ এলাকার মাটির আর্দ্রতা সম্পূর্ণ নষ্ট হইয়া গিয়াছে। ১৭ শতাংশ এলাকা জরুরি অবস্হার মধ্যে পতিত হইয়াছে। দাবদাহ সর্বকালের রেকর্ড ছাড়াইয়াছে। সুবিখ্যাত দানিউব, রাইনসহ অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি এতটাই নামিয়া গিয়াছে যে, নাব্যের কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটিতেছে। চীনে শুরু হইয়াছে ভয়াবহ শুষ্কতা ও নদীর নাব্যসংকট। দাবদাহের কারণে বহু এলাকা অচল হইয়া পড়িয়াছে। আফ্রিকার অবস্হা পূর্ব হইতেই সংকটে। ভারত পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশে ভয়াবহ বন্যা চলিতেছে, যাহাতে ১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ দিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক দাবানল ও দাবদাহ আঘাত হানিতেছে। এই পরিস্হিতি শুধু অর্থনীতিই নহে, মানুষের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হইয়া দেখা দিয়াছে।

এখন প্রশ্ন হইল, মানুষ বিশাল এই প্রকৃতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্হা গ্রহণ করিবে? শিল্পোন্নত দেশগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আজিকার বিশ্বের এই পরিস্হিতির জন্য তাহারাই দায়ী, এবং তাহাদেরকেই পরিস্হিতি মোকাবিলায় মুখ্য ভূমিকা রাখিতে হইবে। কথা সত্য। তবে শিল্পোন্নয়নের সুফল কিন্তু কমবেশি ভোগ করিয়াছে গোটা বিশ্ব। দ্বিতীয়ত মনে রাখিতে হইবে, আকাশের যেমন কোনো সীমান্ত নাই, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনেরও কোনো সীমান্ত বা তারকাঁটার বেড়া নাই। তাই অন্তত এই বিষয় লইয়া সকলের কমন স্বার্থ হিসাবে প্রতিটি দেশকে সমান উদ্দীপনার সঙ্গে আগাইতে হইবে। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নূতন জলবায়ু-বিষয়ক সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন ও জনসচেতনতা গড়িয়া তুলিতে হইবে। নচেত্ হয়তো আমাদের জীবদ্দশাতেই ‘এই পৃথিবীর মানুষ অস্তিত্বের সংকটে পড়িয়াছে’ পরিস্হিতি দেখিতে হইতে পারে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন