প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়ে যাঁরা দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তুলেছেন, তাদের একজন ড. এ কে আব্দুল মোমেন (জন্ম ১৯৪৭)। তিনি ২০১৯ সাল থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি পরিচিত একজন মেধাবী, নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল, সজ্জন ও কর্মপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। উপরন্তু, মন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে, বলা যায় আশির দশক থেকেই তিনি একজন কলাম লেখক। অবশ্য তার বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল কিংবা আওয়ামী লীগের দলীয় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে নানা সময়ের নানা ঘটনাজারিত লেখা নিয়ে এ কে আব্দুল মোমেনের একাধিক গ্রম্হও প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’ (২০২২) পাঠকসমাজে নন্দিত হয়েছে। ড. এ কে আব্দুল মোমেন কেবল মন্ত্রী কিংবা লেখক নন, তিনি অনেক পরিচয়ে গৌরবান্বিত।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সঞ্জাত দুটি ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে সরব হয়েছে বিভিন্ন পক্ষ। উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিলকে তাল করে প্রচার করছে তারা। দুটি ইস্যুর একটি হলো ‘বেহেশত’ ইস্যু। তারা প্রচার করছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’। আরেকটি হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ভারতের সাহায্য চেয়েছেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে’। এ দুটি বক্তব্যই একেবারে বানোয়াট এবং বিকৃতভাবে প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে উদ্দেশ্যে, যেভাবে কথাগুলো বলেছেন, তার ধারেকাছেও না গিয়ে তার খণ্ডিত বক্তব্য নিয়ে নেহাত অসৎ উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
১২ আগস্ট (২০২২) সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণবিষয়ক এক মতবিনিময় সভা শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বৈশ্বিক মন্দায় অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ ভালো আছে। আমরা সুখে আছি, বেহেশতে আছি। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে, একটি পক্ষ এমন প্যানিক ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। এটার কোনো ভিত্তি নেই।’ অন্যদিকে ২২ আগস্ট (২০২২) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমী উয্যাপনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব চেয়েছিলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সম্প্রতি ভারত সফরের সময় দেশটির সরকারের কাছে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঐ সফরে নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি, আঞ্চলিক স্হিতিশীলতা নিয়ে আলাপ হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুয়াহাটিতে গিয়েছিলেন (২৮-২৯ মে, ২০২২)। সেখানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সন্ত্রাসী তত্পরতা বন্ধ হওয়ায় আসামে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সরকারকে বলেছিলেন, ‘দুই দেশের মঙ্গল ও উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।’ কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করে যাতে দুই দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা দেখা দিলে এটা বাংলাদেশেও আঘাত হানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রতীক। তিনি থাকলে অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্হা গড়ে উঠবে। সুতরাং, তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা করা হবে। বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সহায়তা চেয়েছিলেন। ২৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচির কাছে ড. মোমেনের বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকেরা ভারতের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, ‘এসংক্রান্ত মিডিয়া রিপোর্ট তিনি দেখেছেন। মন্ত্রী (মোমেন) ঠিক কী বলেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছে।’ অর্থাৎ, বিষয়টি মিডিয়ায় বিকৃতভাবে প্রচারিত হয়েছে—ভারত এ সম্পর্কে অবগত। কারণ তারাও জানে উক্ত বক্তব্য নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিলকে তাল করা হচ্ছে।
বৃহত্তর সিলেট এলাকায় ভালো জিনিস বোঝাতে যখন-তখন ‘বেহেশতের’ উপমা দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটের স্থায়ী বাসিন্দা বলে এমন উপমা দিয়েছিলেন। ‘বেহেশত’ শব্দটি ‘ভালো অবস্থা’কে বর্ণনার জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে বলেই এ দেশের অর্থনৈতিক সূচকের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে আনা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত। বিভিন্ন রকম সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী গ্রুপ দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। আফগানিস্তানে মসজিদে-মসজিদে হামলা করে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। আমেরিকায় স্কুলের বাচ্চাদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের সংবাদ কারো অজানা নয়। বাংলাদেশে আমরা এসব থেকে অনেক ভালো অবস্থানে আছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনারা বলতে পারেন, ওদের তুলনায় আমরা বেহেশতে আছি।’ একইভাবে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু ভারতের প্রসঙ্গ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যেভাবে জঘন্য অপপ্রচার ও সুস্পষ্ট মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, তা-ও দুঃখজনক। তারা বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সাহায্য চেয়েছেন। আদতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে গিয়ে নির্বাচন নিয়ে কোনো কথাই বলেননি, বরং কথা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় দেখা দেওয়া অস্থিরতা নিয়ে। আমাদের এই অঞ্চলেও বিভিন্ন রকম অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে।
মূলত ভারতের সহায়তা চাওয়া প্রসঙ্গে ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্কালে মুখ্যমন্ত্রী তাকে বলেন, ‘আপনাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’ এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, তার কারণে ভারত নানা দিক থেকে লাভবান হচ্ছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, কোনো ধরনের সন্ত্রাস তিনি সহ্য করবেন না মর্মে যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা ভারতকে মুগ্ধ করেছে। তার কারণে বাংলাদেশে এখন সন্ত্রাসীদের তৎপরতা নেই। তার এই নীতির কারণে মুখ্যমন্ত্রীরাও লাভবান হয়েছেন। এখন বাংলাদেশের মতো আসাম, মেঘালয়েও আর তেমন কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা নেই। আঞ্চলিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। সন্ত্রাসী তৎপরতা না থাকায় বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি এখন আসামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে। আগে যেখানে এক-দুইটা হাসপতাল ছিল, এখন সেখানে ১৭টা নতুন হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এজন্য তারা শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানান। সে সময় আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা খুব দরকার। এই স্থিতিশীলতা যেন আমরা বজায় রাখতে পারি ভারত, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়, সেটা আমাদের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
মুখ্যমন্ত্রীর কথার জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশেই কিছু দুষ্ট লোক বা উগ্রবাদী আছে, যারা বিভিন্নভাবে তিলকে তাল করে উভয় দেশের সাম্প্রদায়িক সুসম্পর্ক বিনষ্ট করতে চায়। ছোট্ট ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে। যার ফলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমরা কোনো আইসোলেটেড কান্ট্রি বা বিচ্ছিন্ন দেশ নই। ভারতে যদি সাম্প্রদায়িক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়ে। এজন্য আমরা উভয় দেশ যেন কোনো উসকানিমূলক আচরণ না করি, সে দিকে সতর্ক থাকলে উভয় দেশেরই লাভ।’
মনে রাখতে হবে, চট্টগ্রামে অনুষ্ঠানটি ছিল জন্মাষ্টমীর এবং অধিকাংশ অতিথি ছিলেন সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে শেখ হাসিনার নীতিকে সহায়তার কথাই বুঝিয়েছিলেন ড. মোমেন সেদিন। বাংলাদেশের মানুষই তাকে ভোট দিয়ে বিজয়ীর আসনে বসাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে যা বলেছেন, তার মর্মার্থ হলো, তিনি চাইছেন এই অঞ্চলে যেন স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। শক্তিশালী দেশ ভারত সবাইকে নিয়ে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে। সেদিক বিবেচনা করেই ভারতের সহায়তা কামনা করেছেন তিনি।
ড. আব্দুল মোমেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন গোটা বিশ্বের সামনে। তার মতো গ্লোবাল বিশেষজ্ঞ দেশে খুব কমই আছে। অথচ তাকে হেয় করতে যেন উঠে পড়ে লেগেছে একটি মহল। আসলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নয়, তাদের মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনা। যে কোনো উপায়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করাই যেন তাদের মূল উদ্দেশ্য। ভারত প্রসঙ্গে অলীক গল্প ফেঁদে আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার ফিল্ড নষ্ট করার অসৎ অপচেষ্টায় সরব এই মহল।
বস্তুত, ওপরে আলোচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বক্তব্য ধরে বিশ্লেষণের পর বলা যায়, তার কথা দিয়ে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে প্রচার করায় কোনো সার্থকতা নেই। কারণ তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প বাংলাদেশে নেই। শুধু বাংলাদেশে কেন, গোটা এশিয়ার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শেখ হাসিনা। তাকে টিকিয়ে রাখতে হবে দেশের আপামর জনগণের মঙ্গলের জন্য এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে। তিনি থাকলে সবার উন্নয়ন সম্ভব। ভারতের উন্নয়নও তার ওপর নির্ভর করে। পুরো এশিয়া তার থেকে লাভবান হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। শেখ হাসিনা এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে বিশ্বাস করেন। কারণ সবার উন্নয়ন না হলে সেটা টেকসই হয় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘Peace is imperative for economic development.’ অর্থাৎ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। যেসব অঞ্চলে বা দেশে স্থিতিশীলতা নেই, সেই সব এলাকা অনুন্নত।
লেখক : বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
