অবকাঠামোগত উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ রক্ষণাবেক্ষণ

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২২, ০৮:০১

ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে, রাজধানী ঢাকার প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গড়িয়া তোলা শেখ রাসেল পার্কটি উদ্বোধনের এক বৎসরের মধ্যেই দখল, দূষণ, অযত্ন ও অবহেলায় বেহাল হইয়া পড়িয়াছে। পার্কে পাবলিক টয়লেট না থাকায় যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ, পার্কের মুখে অবৈধ কাঁচাবাজারসহ নানা দোকানপাট গড়িয়া তোলা, রাত্রিবেলা লাইটের ব্যবস্থা না থাকা, মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আড্ডা ইত্যাদি অব্যবস্থাপনা দেখিয়া মনে হয় না, পার্কটি তদারকি করিবার জন্য কেহ আছেন। পার্কটিতে বিভিন্ন জেলার নামসহ একটি টাওয়ারে বসানো হইয়াছে একটি বিশাল আকৃতির ঘড়ি; কিন্তু মাত্র এক বৎসরের ব্যবধানে সেই টাওয়ারের লেখাগুলি কীভাবে খসিয়া পড়িল? বসিবার জায়গার টাইলসগুলি কীভাবে উঠিয়া গেল? কেবল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এমন একটি সুন্দর পার্ক ক্রমেই সৌন্দর্যহীন ও নাজুক হইয়া পড়িতেছে।

আলোচ্য পার্কটির নামকরণ করা হইয়াছে ১৫ আগস্ট ট্র্যাজিডির ঘটনায় নির্মমভাবে শহিদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেলের নামে। যদি কোনো স্থাপনার সৌন্দর্য ধরিয়া রাখিবার মাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মর্যাদা ধরিয়া রাখা না যায়, তাহা হইলে সেই সকল স্থাপনার সহিত তাহাদের নামটা যুক্ত করা হয় কেন? শেখ রাসেল পার্কটিকে অযত্নে রাখিবার অর্থ কি শেখ রাসেলের প্রতি অবমাননা নহে? আমরা বরাবরই বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়া আসিতেছি; কিন্তু কে শোনে কাহার কথা! রাজধানীতে মৎস্য ভবন চত্বরের সম্মুখে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি ঘড়ি স্থাপন করা হয়; কিন্তু মেরামতের অভাবে ইহা এখন অকেজো অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ইত্তেফাকে সেই ছবিও ছাপা হইয়াছে গুরুত্বের সহিত। আমরা নূতন নূতন রাস্তাঘাট, কালভার্ট-ব্রিজ, পার্ক, দর্শনীয় স্থাপনা ইত্যাদি নির্মাণ করিয়া চলিয়াছি; কিন্তু তাহা রক্ষণাবেক্ষণে আমরা অধিকাংশ সময় বেখেয়াল ও উদাসীন। এই উদাসীনতার কারণে ঢাকা শহরের ৩৯টির মধ্যে এখন ৩৩টি পার্কেরই অস্তিত্ব আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। যেখানে বীর আলেকজান্ডারের দেশ মেসিডোনিয়ায় পরিবেশ রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দুর্গম-বন্ধুর পর্বতমালায় সবুজ-শ্যামল পার্ক নির্মাণ করা হইতেছে, সেখানে আমরা বিদ্যমান পার্কগুলি অবহেলা-অনাদরে নষ্ট করিতেছি! এই জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই জবাবদিহি করিতে হইবে।

কোনো স্থাপনা নিয়মমাফিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা হইলে তাহার মান ও স্থায়িত্ব ধরিয়া রাখা যায় না। কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করা দূর অস্ত, অল্পসময়েই সেইগুলি হইয়া পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। হইয়া উঠে দুর্ঘটনা ও বিপদের কারণ। অথচ অনেক সময় সামান্য মেরামতের কাজ করিলে ঐ সকল স্থাপনা রক্ষা করা যায়; কিন্তু আমরা একেবারে অচল না হওয়া পর্যন্ত সেই কাজটি করিতে চাহি না। ইহাতে খরচ যেমনি বাড়ে, তেমনি বাড়ে জনদুর্ভোগও। এই জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হইল রক্ষণাবেক্ষণ। উন্নত দেশসহ সর্বত্রই ইহার প্রতি প্রাধিকার দেওয়া হয়। কোথায় কোন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে এবং কোথায় স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন সেই ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য থাকে কর্তৃপক্ষের নিকট। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য থাকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দও। সেই অনুযায়ী আমাদের মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। শহিদ মিনার, বিভিন্ন পার্ক, সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও ফুটওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, ওভারপাসসহ সকল অবকঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। সড়ক সারফেসে পটহোল মেরামত, ফাটল ভরাট, ঘাস-আগাছা অপসারণ, গাড়িচালকের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী শাখা বা বৃক্ষ অপসারণ, কালভার্ট-সেতু-পার্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সাইন-সিগন্যাল মেরামত, শোল্ডার হইতে বৃষ্টির পানি অপসারণ, বিভিন্ন স্থাপনা হইতে ভবঘুরে, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের উচ্ছেদ, অবৈধ দোকানপাটের উচ্ছেদ ইত্যাদি কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করিতে হইবে। যেহেতু ছোটবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ, তাই জমিদারবাড়ির দিকে না তাকাইয়া অনেক সময় ছোট্ট স্থাপনা নির্মাণ করাই যুক্তিযুক্ত। মোটকথা, আমরা যে স্থাপনাই নির্মাণ করি না কেন, তাহা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাজেট ও ব্যবস্থাপনার কথা অবশ্যই ভাবিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন