মুক্তাদা আল-সদরের রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণায় ইরাকে সংঘর্ষে নিহত ৩০

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২, ০২:০১

দুই মাস আগে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে বিক্ষোভকারীদের উল্লাস করতে দেখা গিয়েছিল। প্রাসাদের সুইমিং পুলে গোসল করতেও দেখা যায় তাদের। সেই একই দৃশ্য এবার চোখে পড়ল ইরাকে। ইরাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তাদা আল-সদর রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তার সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। যদিও সদর তার সমর্থকদের সহিংস বিক্ষোভ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে সহিংসতার জেরে ইরান ইরাকের সঙ্গে থাকা সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সদর টুইটারে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর তার সমর্থকরা ইরাকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে আরো বেশ কয়েক জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সদর ইরাকের রাজনীতিতে খুবই জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনীতিক। দেশটিতে তার লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে এবং তিনি সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ সংকটের কেন্দ্রে ছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনে সদরের রাজনৈতিক মিত্ররা বেশির ভাগ আসনে জয়ী হয়। কিন্তু সরকার গঠন নিয়ে শিয়া মতাবলম্বী অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তার পক্ষের পার্লামেন্ট সদস্যরা পদত্যাগ করেন।

এর আগে রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রতিবাদে পার্লামেন্ট ভবনের ভেতর ঢুকে তাণ্ডব চালানোর পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে শত শত লোক তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর দেশটির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া সব রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানোর দুই দিন পর সদর অবসরের ঘোষণা দেন। আল-সদর এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমি আর রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে থাকতে চাই না। তাই আমি রাজনীতি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি আমি মারা যাই বা আমাকে হত্যা করা হয়, তাহলে আমার জন্য প্রার্থনা করবেন।’ তবে তার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ধর্মীয় সাইট খোলা থাকবে বলে জানান তিনি। ইরাকের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইএনএ পরে জানিয়েছে, রাজনীতিতে সহিংসতা ও অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সদর অনশনের ঘোষণা দিয়েছেন।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশের পর সুইমিং পুলে গোসল করছে আল-সদরের সমর্থকরা —সিএনএন

সদরের ঘোষণার পরই তার অনুসারীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে শুরু করে। এর জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। বাগদাদে সংঘর্ষের ঘটনায় কমপক্ষে আট জনের মৃত্যু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় নিরাপত্তা বাহিনী। এরই মধ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে বাগদাদে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে বিক্ষোভকারীরা ঢুকে পড়েন। একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। সুইমিং পুলে নেমে গোসল করতেও দেখা গেছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট কোথায় রয়েছেন, তা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল কাধিমি জানিয়েছেন, পরবর্তী ঘোষণা পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠক বাতিল করলেন। সামরিক বাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি ভবন, আন্তর্জাতিক মিশন, বেসরকারি বাড়ি রক্ষার দায়িত্ব তাদের। সেনার তরফ থেকে জানানো হয়, বাগদাদে কারফিউ জারি করা হয়েছে। কিন্তু এরপরেও আল-সদরের সমর্থকরা বিক্ষোভ জারি রেখেছেন। বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, তারা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বদ্ধপরিকর। বাগদাদে গ্রিন জোনের বাইরেও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা সমানে গুলির শব্দ পাচ্ছেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। আল-সদরের সমর্থক এবং ইরানপন্থি গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি চলেছে। বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দর যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। আমেরিকায় হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, তারা ইরাকে দূতাবাস বন্ধ করার কথা ভাবছেন না। তবে তিনি জানিয়েছেন, ইরাকে অস্থিরতার ঘটনায় আমেরিকা চিন্তিত। তবে আল-সদর তার সমর্থকদের বিক্ষোভ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরাক সরকার এবং জাতিসংঘ তার এই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছে। এদিকে ইরাকের সঙ্গে থাকা সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এছাড়া নিজেদের নাগরিকদের ইরাক সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে তেহরান। গতকাল মঙ্গলবার তেহরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব কথা জানান।

বর্তমানে রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরাক। গত অক্টোবর মাসে পার্লামেন্ট নির্বাচনে মুক্তাদার দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনে জটিলতা তৈরি হয়। জোট সরকার গড়তে রাজি হননি তিনি। যার ফলে এখনো সরকার গঠন হয়নি সে দেশে। পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মুক্তাদার রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণায় নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ইরাকে।—বিবিসি, আলজাজিরা ও ডয়চেভেলে

ইত্তেফাক/ইআ