আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১০ আগস্ট ১৯৯২ তারিখে টোপেক্স/পসেডন নামের নতুন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়, লক্ষ্য ছিল সময়ের পরিক্রমায় সমুদ্রের পানি কীভাবে ওঠানামা করে তা পর্যবেক্ষণ করা। আগে এ পরিমাপটা সরেজমিনে করতে হতো। টোপেক্স/পসেডন দিয়ে শুরু করে নাসা ও সহযোগী মহাকাশ সংস্থাসমূহ সমুদ্রপৃষ্ঠের টপোগ্রাফি পরিবীক্ষণের জন্য রাডার অলটিমিটার সুবিধা-সংবলিত উপগ্রহ ধারাবাহিকভাবে পাঠিয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত উৎক্ষিপ্ত পাঁচটি উপগ্রহ হলো টোপেক্স/পসেডন; জেসন-১, ২ ও ৩ এবং সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ। শেষোক্তটি ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর উৎক্ষিপ্ত হয়েছে এবং সেন্টিনেল-৬বি ২০২৫ সালে পাঠানো হবে।
এ উপগ্রহগুলো বিগত ৩০ বছরে পুরো বিশ্বের উপাত্ত ইতিমধ্যে সংগ্রহ করেছে। সমুদ্রতট থেকে সংগৃহীত আগের উপাত্তের সঙ্গে উপগ্রহ উপাত্ত মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঠছে এবং তা দ্রুত হারে। ১৯৯২ সাল থেকে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ১০ দশমিক ১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। টাইড গজ ও উপগ্রহ উপাত্ত মিলিয়ে দেখা যায়, বিগত ১৪০ বছরে এই উচ্চতা ২১-২৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার গড় বৃদ্ধির হার ছিল প্রতি বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিমিটার। কিন্তু গত শতকের নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে এই হার ছিল প্রতি বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার, যা গত দশকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ মিলিমিটারে পৌঁছেছে। সাইটেক ডেইলিতে গত ১৯ আগস্ট ২০২২ প্রকাশিত নাসা আর্থ অবজারভেটরির মাইকেল কারলোউয়িজ প্রণীত নিবন্ধে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সবগুলো উপগ্রহ থেকে সমরূপ ও স্বীকৃত মানের যে পরিমাণ উপাত্ত আহরণ করা হয়েছে, তা অর্ধ মিলিয়ন টাইড গজ থেকে সংগৃহীত উপাত্তের সমপরিমাণের। গবেষকগণ যে উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন এবং সঠিক বলে সমর্থন দিয়েছেন, সময় বিবেচনায় তার পরিমাণ পর্যাপ্ত ও সংবেদী হওয়ায় তা দিয়ে ঋতু, বার্ষিক ও দশক চক্রে বৈশ্বিক ও স্থানীয় সমুদ্রপৃষ্ঠতলের প্রাকৃতিক পরিবর্তনসমূহ নিরূপণ করা যাবে। যদিও প্রতি বছরে কয়েক মিলিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধিকে অল্প মনে হয়, কিন্তু বিজ্ঞানীগণ হিসাব করে দেখেছেন, প্রতি ২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মানে গড়ে উপকূলভাগের সমুদ্রসৈকতের ২ দশমিক ৫ মিটার হারিয়ে যাওয়া। এতে সহজেই ধারণা করা যায়, জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে এটা আরো বাড়বে। ফলে উপকূলভাগ বেশি বন্যাকবলিত হবে। গত ৩০ বছরের উপাত্ত বলছে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রাকৃতিক চক্রে বৃদ্ধির চেয়ে ১০ গুণ বড়।
রাডার অলটিমিটার অবিরামভাবে মাইক্রোওয়েভের নিয়মিত স্পন্দন পাঠায় যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে উপগ্রহে ফিরে আসে। ফেরত আসা সংকেতের নেওয়া সময়কে গণনা করা, পাশাপাশি মহাকাশে উপগ্রহের অবস্থানকেও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাদি দ্বারা অনুসরণ করা হয়, যা থেকে বিজ্ঞানীগণ উপগ্রহের সরাসরি নিচের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হিসাব করেন। তবে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির দ্বারা আমাদের দেশের অবস্থার পুরো ব্যাপারটি বোঝা যায় না। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বিশ্বের সব জায়গায় এক রকম নয়, উপসাগর ও উপকূলবর্তী দ্বীপগুলো রাডার স্পন্দনকে বিকৃত করে। কাজেই স্থানীয় ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে রাডার সংকেতে তার প্রতিফলন ঘটায়। পৃথিবীর অন্যান্য উপকূলের মতো বাংলাদেশের উপকূলও স্থিতিশীল নয়, বরং বেশি গতিময়। আবার ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল পুরোটা এক রকম নয়—তিনটি অংশে ভাগ করা যায়: (১) পশ্চিমের গাঙ্গেয় বদ্বীপ ও টাইডাল প্লেইন, (২) মাঝের সক্রিয় মেঘনা মোহনা এবং (৩) পুবের স্থিতিশীল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূল অঞ্চল। এই অংশগুলোতে উপকূল গঠনের প্রক্রিয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতায় যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি জোয়ারের উচ্চতায়ও পার্থক্য আছে। এই উপাদানগুলো ছাড়াও উপকূল অঞ্চলের অগভীর সমুদ্র তলদেশের টপোগ্রাফিও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। আমাদের দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর বসবাস। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও জীবন-জীবিকার অন্যান্য উপকরণের জোগান দেয়, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চল প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়, তদুপরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ঝুঁকি তো আছেই। ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য থাকায় তিনটি অংশে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবেও ভিন্নতা আছে, তেমনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার প্রভাবও পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সমভাবে পড়বে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামার সঙ্গে এই এলাকায় পলির সঞ্চয়ন ও ভূমির অবনমন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অধিকন্তু, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন উপকূল অঞ্চল তথা দেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ; যা অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষেত্রে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার ও বৈশিষ্ট্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রিয়াশীল উপাদানগুলোর মিথস্ক্রিয়াকে জানা আবশ্যক। এজন্য উচ্চশুদ্ধতায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ, ঘনিষ্ঠ পরিবীক্ষণ ও দীর্ঘ সময়ক্রম সমজাতিক উপাত্ত দরকার—এগুলোর প্রয়োজন মেটাতে আধুনিক ও দ্রুত রূপান্তরশীল (এ ক্ষেত্রে দিন-রাত ও মেঘ ভেদ করে উপাত্ত সংগ্রহে সক্ষম রাডার সুবিধা-সংবলিত) উপগ্রহ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন, ভূপ্রাকৃতিক ভিন্নতার প্রেক্ষাপটে নিজস্ব তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং যুগোপযোগী ও স্বনির্ভর থাকতে আমাদের প্রচেষ্টা রাখা দরকার।
লেখক : গবেষক, ভূতত্ত্ববিদ

