আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু টের পান যে, তার চারপাশে গভীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত গড়ে উঠেছে। তখন তিনি স্মরণ করলেন, তার বিশ্বস্ত সহযোগী, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদে চাকরিরত অবস্থায় গোপনে তার পাশে এসে দাঁড়ানো ও তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি আমার মামা রুহুল কুদ্দুস সাহেবকে। জুলাই মাসে খুনি চক্র তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সচিবালয়ের বহির্গমনের গেটে তার মার্সিডিজের ওপর খাদ্য ভবনের দিক থেকে খাদ্য বোঝাই ট্রাক দিয়ে সবেগে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি মারাত্মক আহত হলে বঙ্গবন্ধু তার চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে প্রেরণ করেন। অনুরূপভাবে খুনিচক্র ১৫ আগস্টের রাত সাড়ে ১০টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কর্নেল জামিলকে হত্যার জন্য তার গাড়ির ওপর আরেকটি গাড়ি তুলে দিয়েছিল। তিনি কোনোক্রমে বেঁচে যান।
১৫ আগস্টে যে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রের গুপ্ত কথা জানতে আমি ’৯৪ সালে এক সরকারি কাজে চট্টগ্রাম গিয়ে বঙ্গবন্ধুর তদানীন্তন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে ’৯৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার তার ১১৫/বি জামাল খান রোডের বাসায় সাক্ষাত্ করেছিলাম। তিনি প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকার সময় যখন ঢাকার তিন নম্বর মিন্টু রোডের বাসায় থাকতেন, তখন তার একান্ত সচিব ’৭১ সাল থেকে আমার বন্ধু অধ্যাপক সুরঞ্জন সেনের সঙ্গে বহুবার তার বাসায় গিয়েছি। তার জামালখান রোডের বাসায় উক্ত সাক্ষাত্কারের সময় তার ডাক্তার পুত্র ডা. মঈনুল ইসলাম চৌধুরীসহ তাদের পরিবারের আরো লোকজন উপস্থিত ছিলেন এবং অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি বারবার বাকরুদ্ধ কণ্ঠে, চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি, এর দায়দায়িত্ব সফিউল্লাহ্, সেনাবাহিনী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর চেয়ে আমার সবচেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু আমি এক জনের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলাম। আমাদের কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের গোয়েন্দারাও সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আমাদের বারবার সতর্ক করছিল। কিন্তু সন্তানতুল্যরা কেউ যে পিতার প্রাণ বধ করবে, এটা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসই হতো না। বিশ্বাস করতেই পারতেন না তিনি।’
সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক। মুসলিম বিশ্বের সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক মহান রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদ ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় এসেছিলেন। তার ঢাকা আগমনের পূর্বেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিষয়ক আমার লেখা ১ হাজার পৃষ্ঠাসংবলিত বই Bangladesh wins freedom; লেখকের উপহারস্বরূপ কুয়ালালামপুরে তার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সোনারগাঁও হোটেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি বলেন, ‘তোমার বই পুরোটা আমি পড়ে এসেছি। নেলসন ম্যান্ডেলার চেয়ে তোমাদের শেখ মুজিবের কৃতিত্ব অনেক বড়। বিশ্বমানবজাতির ইতিহাসে এমন কোনো নেতা নেই, যিনি বন্দি অথচ যার নামে একটি দেশ ও ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে এবং একটি জাতি তার নামের শক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।...আমার নিজের কথা বলছি না, তোমাদের প্রতিবেশী ভারত পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর নামে এবং অন্যান্য অনেক দেশ তাদের স্বাধীনতার রূপকারদের নামে উন্নতি ও সমৃদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। তোমাদের জাতির ভাগ্যে সেখানে বড় একটা ট্র্যাজেডি দেখে খুব অনুতাপ হয়। আফসোস হয়।’
বঙ্গভবনে আমি ১৯৭২ সাল থেকে (১৯৭৭-৮১ ব্যতীত) ১৯৮২ পর্যন্ত ছয় জন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন পদমর্যাদায় চাকরি সূত্রে তাদের রাষ্ট্রীয় সফরসঙ্গী হিসেবে ৩৮টি দেশ সফর করি। ’৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক ও সরকারপ্রধান আমাদের সমর্থন দেন, সুযোগ ও সুবিধামতো বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করি। তন্মধ্যে ৩১ জন বিশ্বনেতার সাক্ষাত্কারসংবলিত ‘বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থে কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোর সাক্ষাতকারের শেষাংশ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করছি। সাক্ষাতকারের শেষ পর্যায়ে ম্রিয়মাণ চিত্তে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের জীবন রক্ষায় চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুংকে আমি যে ফোন করেছিলাম, সেটা ছিল, বিশ্বমানবজাতির পক্ষ থেকে বিশ্বনেতাদের দায়বদ্ধতা ও কর্তব্য বোধের অংশ। কিন্তু জাতিসংঘে যখন তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়, তখন বিশ্বনেতাদের মধ্যে তার মতো আর কাউকে আমি দেখেছি, তেমনটি আমার মনে পড়ে না! তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ভরা দৃষ্টি আমার থমকে গেছে। তার দৃষ্টিতে স্বর্গীয় এক দ্যুতি ও শান্তির সম্মোহনী কিরণ ঝলমলিয়ে উঠত। আমি শেখ মুজিবকে আলিঙ্গন করেছিলাম ও গভীর প্রশান্তচিত্তে শান্তি অনুভব করেছিলাম।’
১৯৭৫ সালে এপ্রিল মাসে কানাডার অটোয়ায় কমনওয়েলথের এক মিটিংয়ে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব মনোয়ারুল ইসলাম যোগ দেন। তাকে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো ব্যক্তিগতভাবে বলেন, ‘তুমি দেশে ফিরেই এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলবে যে, তাকে হত্যার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। তাকে আমার নাম করে বলবে সব ধরনের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে।’ যুগ্মসচিব মনোয়ারুল ইসলাম ঢাকায় ফিরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর সতর্কবাণী ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুকে জানান। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, ‘পুলিশ-আর্মির ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে আমার গরিব-দুঃখী মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকব, তারা এসে আমাকে একনজর দেখতে পাবে না, এমন জীবন আমি চাই না।’ কী মহত্প্রাণ ও জনদরদি নেতা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান! ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশ্বের আরো কয়েক জন নেতার উদ্ধৃতি প্রদান এখানে জরুরি বলে মনে করি। যেমন :জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডিট মন্তব্য করেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যার জন্য মানবজাতির কেউ তোমাদের আর বিশ্বাস করে না এবং এই হত্যাকাণ্ড মানবজাতির জন্য বিষাদের অধ্যায়।’ সাবেক মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বলেন, ‘শেখ মুজিবের ধ্যানজ্ঞান ছিল বাংলাদেশ ও বিশ্বশান্তিএবং তিনি ছিলেন যুদ্ধবিরোধী ও বর্ণবাদবিরোধী, যার সঙ্গে আমার আদর্শের সাদৃশ্য ছিল।’ ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস মিঁতেরা বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য জাতি তাদের জাতীয় বীরদের নামের শেষে যেভাবে দ্য গ্রেট লেখে, তোমাদের জাতির বীর শেখ মুজিবের নামের শেষে সেভাবে তোমরা দ্য গ্রেট লেখো না কেন?’ সর্বোপরি তত্কালীন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড হিথ বলেন, ‘শেখ মুজিব ছিলেন বিধাতার এক পুণ্যময় উপহার’। আমরা আগস্টের এই শোকের মাসে বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক : স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখক ও সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার
