অনিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:১৮

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো চিকিৎসা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে নাগরিকদের এই সকল অধিকারের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু মানুষ সবচাইতে অধিক বঞ্চিত হইতেছে এই সকল অধিকার হইতেই। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটিবিচ্যুতি, অনিয়ম ও দৈন্যদশা রহিয়াছে। একসময় চিকিৎসাসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছাইয়া দেওয়ার জন্য বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হয়; কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাব, বিকাল ও রাত্রে পার্টটাইম সরকারি জনবলের উপর এখনো নির্ভরশীলতা, সেবার বদলে অধিক মাত্রায় বাণিজ্য মানসিকতা, ভুল চিকিৎসা, দালালদের দৌরাত্ম ইত্যাদি কারণে বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হইতে থাকিল। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে চিকিৎসা গ্রহণে বিদেশনির্ভরতা বাড়িতেছে। ইহারই মধ্যে আইসিডিডিআর,বির একটি গবেষণায় বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার মূল সংকটকে আরো উন্মোচিত করিয়াছে। তাহারা বলিতেছেন, কাগজে কলমে দেশে বৈধ বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা মাত্র ৬ শতাংশ। কী ভয়াবহ তথ্য! যেইখানে নাগরিকদের চিকিৎসার সহিত জীবনমরণের প্রশ্ন জড়িত, সেইখানে বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলি এতটা মাত্রায় অবৈধ হয় কীভাবে? আর অবৈধ প্রতিষ্ঠানের উপর আমরা আস্থা ও ভরসা রাখিব কী করিয়া?

দেশে বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার বিকাশকে আমরা অত্যন্ত ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করিয়া থাকি। ইহার মানে কোনো নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলাকে সমর্থন করা নহে। শুধু চিকিৎসা কেন, যে কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মকানুন মানিয়াই পরিচালনা করিতে হইবে। আর চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বেলায় ইহা সবচাইতে জরুরি। চিকিৎসার নামে কেহ মানুষের জীবন লইয়া খেলিতে পারেন না। আইসিডিডিআর,বি (উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ) একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। তাহারা ১২টি সিটি করপোরেশনের ১০ জেলার ২৯টি উপজেলায় ১ হাজার ১১৭টি বেসরকারি হাসপাতালের উপর এক গবেষণা জরিপ পরিচালনা করেন। সেইখানে দেখা যায়, ১৬১টি বা ১৪ শতাংশ হাসপাতাল কখনোই সরকারি নিবন্ধন গ্রহণ করে নাই। অবশিষ্ট ৯৫৬টি হাসপাতালের মধ্যে ৮৮৬টি বা ৮৬ শতাংশের মেয়াদ শেষ হইয়া গিয়াছে। বৈধ লাইসেন্স ছিল ৬৬টি হাসপাতালের, যাহা গবেষণার আওতায় আসা মোট হাসপাতালের মাত্র ৬ শতাংশ। উক্সে­খ্য, ১৯৮০ সাল হইতে দেশে বেসরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অগ্রগতি সাধিত হয়। ইহার পর সবচাইতে অধিক বেসরকারি হাসপাতাল গড়িয়া উঠিয়াছে ২০০৭ সাল হইতে ২০১৭ সালের মধ্যে। বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভর করে বেসরকারি হাসপাতালের উপর; কিন্তু এত অধিকসংখ্যক হাসপাতাল নিবন্ধনের বাহিরে থাকিলে সঠিক চিকিৎসা প্রদান কীভাবে সম্ভব? আসলে আমাদের গোড়ায় গলদের বিষয়টি অবশ্যই ভাবিয়া দেখিতে হইবে।

মানুষকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দিতে হইলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামোর সদ্ব্যবহার করিতে হইবে। ইহার সহিত বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থাকে দেখিতে হইবে আশীর্বাদ হিসাবে; কিন্তু ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালের উপর যেই সকল শর্তারোপ করা হয়, তাহা সংশোধনপূর্বক সহজীকরণের উদ্যোগ না নেওয়া হইলে নিবন্ধনের হার বাড়িবে না। এই বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকাটাও বিপজ্জনক। যথাযথ ও যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা না থাকিলে নৈরাজ্য দেখা দেওয়াটাই কি স্বাভাবিক নহে? বর্তমানে দেশে অনিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালিত হইতেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত গতকালের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথম দুই দিনে ঢাকা মহানগরসহ দেশের আট বিভাগে ৫২৪টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার বন্ধ করিয়া দিয়াছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জরিমানা করা হইয়াছে ৯ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। ইহাতে ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড় হইয়া যাইবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে। এত বিপুলসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতাল অনিবন্ধিত কেন-ইহা একটি বড় প্রশ্ন। নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করিয়া অবিলম্বে এই সকল হাসপাতাল নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শুধু বন্ধ করিয়া দেওয়াটা কোনো সমাধান নহে। কেননা ইহাতে আবার নূতন করিয়া চিকিৎসাসংকট দেখা দিতে পারে। অতএব, বেসরকারি হাসপাতালগুলি যাহাতে নিবন্ধিত ও আইনকানুন মানিয়া পরিচালিত হয়, তাহা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই নি­শ্চিত করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন