বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বুয়েট থেকে এমআইটি

স্বপ্নজয়ী শিক্ষক দম্পতির গল্প

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পিএইচডি সম্পন্ন করে আবারও বুয়েটের শিক্ষাকতায় দুই প্রাক্তন বুয়েটিয়ান— নাদিম চৌধুরী ও তাকিয়ান ফখরুল। বিদেশে উন্নত জীবনের হাতছানি ও অবারিত সম্ভাবনা উপেক্ষা করে দেশপ্রেমিক এই দম্পতি দেশের ফিরে এসেছেন। তাদের পথচলার গল্প তুলে ধরেছেন মো. আরিফ হাসান

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:১৭

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে খুব ছোটবেলাটা কাটানো তাকিয়ান ফখরুল দেশে ফিরেন ৭ বছর বয়সে। বাবার বুয়েটের অধ্যাপনার সুবাদে এরপরের সময়টা কাটে বুয়েট ক্যাম্পাসেই। স্কলাসটিকায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকেই তিনি ও-লেভেল সম্পন্ন করেন। পরে মাস্টারমাইন্ড স্কুল থেকে এ-লেভেল সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে ঢাকা নেভি স্কুলে প্রাঙ্গণে শুরু হয় নাদিম চৌধুরীর পথচলা। জীবনের প্রথম পরীক্ষার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'নার্সারির ভর্তি পরীক্ষায় আমি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর না পারায় পুরো পরীক্ষায় আমি পরের কোনো প্রশ্ন উত্তর করিনি, কারণ আম্মু শুধু বলেছিলেন একটার পর একটা উত্তর করতে।'

সেসময় খুব ভালো ছাত্ররাই বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতো বলে মায়ের বাধ্য ছেলে নাদিম পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করতে পারেননি। গণিতে কাঁচা হওয়ায় ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়ার কষ্টটা তার মনে ভীষণ দাগ কাটে। এরপর অষ্টম শ্রেণিতে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি। এরপর গণিত, পদার্থবিজ্ঞানকে নিজের প্রিয় বিষয় বানিয়ে ফেলা নাদিম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৫ম স্থান অধিকার করে নিজেকে নতুন করে চেনান। বুয়েটে পঞ্চম হওয়ার অনুভুতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সত্যি বলতে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা একটা ছেলে হিসেবে বুয়েটে এতো ভালো স্থান করার মতো খুশি এমআইটি সুযোগ পাওয়ার পরও হইনি।'

শিশুসন্তানের সঙ্গে নাদিম ও তাকিয়ান

অন্যদিকে ও-লেভেলে পদার্থবিজ্ঞানে বি-গ্রেড পাওয়ার কষ্টটা নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে সাহায্য করে তাকিয়ানকে। তিনি বলেন, 'এই খারাপ রেজাল্টের কষ্টটা আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে যায়৷ এরপর আম্মুর আর কোনোদিন আমাকে পড়তে বলতে হয়নি। মজার ব্যাপার হলো, তখন রেজাল্ট পরিবর্তনের জন্য চ্যালেঞ্জ করে আমি এ-গ্রেড পেয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে আমি নিজেকে অনেকটাই শুধরে নিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে গিয়েছি।' এ-লেভেল শেষে মাত্র তিন মাসে উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাস শেষ করে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন তাকিয়ান। ২০০৭ সালে বুয়েটে চান্স পেয়ে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি বেছে নেন বস্তুু ও ধাতব কৌশল বিভাগ।

একই ব্যাচে পঞ্চম হওয়া নাদিম ভর্তি হন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় এসএসসির পরদিন থেকেই টিউশনি করে পরিবারে অবদান রাখতেন নাদিম। মাত্র দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ায় তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে পড়েন। এই সময়টাতেই বুয়েট জীবনের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করলেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর পরিশ্রমী নাদিম আর কোনোদিনি জিপিএ-৪ হাতছাড়া করেননি। স্নাতক পর্যায়ে তিনি ৩.৯৯ সিজিপিএ নিয়ে পুরো বুয়েটের মধ্যে প্রথম হন এবং ভাইস-চ্যান্সেলর পদক অর্জন করেন। এছাড়াও তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল অনুষদে প্রথম হওয়ার সুবাদে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক অর্জন করেন। অন্যদিকে তাকিয়ানও প্রকৌশল অনুষদে প্রথম হয়ে স্নাতক শেষ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক অর্জন করেন। আর পরবর্তীতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পুরো বুয়েটে প্রথম হওয়ায় ড. রশীদ স্বর্ণপদক অর্জন করেন। 


দু'জনই ২০১২ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে বুয়েটেই প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নের সময় এই দুই সহকর্মী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মজার ব্যাপার হলো, বিয়ের কিছুদিনের পরই ফল-২০১৫ সেশনে তারা দুজনই এমআইটি থেকে নির্বাচিত হওয়ার চিঠি পান, আর পাড়ি জমান স্বপ্নের এমআইটিতে। বাংলাদেশিদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য নাদিম ও তাকিয়ান এমআইটির বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। এমনকি তারা দুজনই ভিন্ন সময়ে অ্যাসোসিয়েশনে তিনবছর সভাপতি ও সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমআইটি'র মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে তাকিয়ান বলেন, 'খুব ভালো সিজিপিএ আর গবেষণার অভিজ্ঞতা যেকোনো শিক্ষার্থীকে অনেকখানি এগিয়ে রাখবে। এছাড়াও ভালো লেটার অফ রিকমেন্ডেশন, স্টেটমেন্ট অব পারপাস ও ভাষাগত দক্ষতা, সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবার উচিত কোনো অংশে ঘাটতি থাকলে অন্যটা দিয়ে তা পূরণ করে ফেলা।'

এমআইটি ক্যাম্পাসে

দেশসেরা আর বিশ্বসেরা দুই প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করা নাদিম-তাকিয়ানের কাছে তাদের সবচেয়ে সুন্দর সময় নিয়ে জানতে চাইলে নাদিম বলেন বুয়েট ইইই ও আহসানউল্লাহ হলে কাটানো সময়টার কথা। তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমত ছিল তাকিয়ানের। তিনি এমআইটিতে কাটানো সময়টাই বেশি উপভোগ করেছেন। পিএইচডি-তে থাকাকালীন সময়ে তার গবেষণা এমআইটি নিউজে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে বরাবরই সবকিছুতেই সেরা হওয়া নাদিম এমআইটিতে গিয়েও জিতেছেন সেরা থিসিসের পুরস্কার। এমআইটিতে পড়াশোনা শেষে আমেরিকার বিশ্বসেরা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রফেসর কিংবা বহুজাতিক সব কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা দেশে ফিরে বুয়েটেই অধ্যাপক হিসেবে আবারও যোগ দেন।

দেশে ফেরার অনুপ্রেরণা জানতে চাইলে নাদিম বলেন, 'প্রথমত, বুয়েটেও এমআইটির মতো অসম্ভব মেধাবী ছেলেমেয়েরা আছে, তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিকে শীর্ষ পর্যায়ে নিতে কাজ করতে চাই।' আর তাকিয়ান স্বপ্ন দেখেন তার সব গবেষণা ও পরিশ্রম একসাথে করে এমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের, যা বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেকখানি সহজ করে তুলবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন