বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

খরাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের গবেষণায় সিকৃবি

খরার সময় চা-পাতা তোলা গেলে নবদিগন্তের সূচনা হবে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৩১

সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাস খরার সময় বাংলাদেশে চা-পাতা তোলা সম্ভব হয় না। ‘এই সময়ে চা-পাতা তোলা গেলে দেশের চা-শিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে’—বলেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও চা উৎপাদন প্রযুক্তি বিভাগের প্রফেসর ড. এ এফ এম সাইফুল ইসলাম। তবে এ বিষয়ে প্রচণ্ড আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এতে সফল হলে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে। দেশ লাভবান হবে।’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চা-বাগানে ‘ড্রট টলারেন্ট ভ্যারাইটি’ বা ‘খরা সহিষ্ণু’ চায়ের জাত উদ্ভাবনের গবেষণা চলছে। সিকৃবির গবেষক দলটি দেশবিদেশের বিভিন্ন বাগানের সেরা চায়ের চারা সংগ্রহ করেন। তারা দুর্গম টিলার চা-বাগানগুলোতে সেচের পরিমাণ কমিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে চা-গাছ টেকানো যায় কি না, তা পরীক্ষা করছেন। ড. এ এফ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গবেষণায় মাইট (পাতার রস খেয়ে ফেলে এমন এক ধরনের ক্ষুদ্র পোকা) ও অন্যান্য পোকা চা-পাতার কী কী ক্ষতি করছে সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং মাইট ও পোকা সহিষ্ণু চায়ের জাত উদ্ভাবনেরও চেষ্টা চলছে।’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রধান গেটের বাঁদিকে মোড় নিলেই উঁচু দুটি  টিলা। টিলার ওপরে রয়েছে বাঁশ ও বেতের একটি শেডের নিচে থরে থরে সাজানো চা-গাছ। সেখানেই চলছে চা নিয়ে গবেষণা। বিভাগের প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম জানালেন, দুই একর জায়গা নিয়ে দেশের অন্যতম এই অর্থকরী ফসলের চাষ ও গবেষণা চলছে গত তিন বছর ধরে। এটি গড়ে তুলেছে কৃষি অনুষদের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও চা উৎপাদন প্রযুক্তি বিভাগ।

ক্যাম্পাসের এই চা-বাগানটি প্রাথমিক অবস্থায় এনএটিপির প্রজেক্ট ছিল। পরে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বড় একটি জার্মপ্লাজম স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও চা উৎপাদন প্রযুক্তি বিভাগ এবং কীটতত্ত্ব বিভাগ এই গবেষণায় সরাসরি যুক্ত হয়েছে। প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. এ এফ এম সাইফুল ইসলাম ছাড়াও এই গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মালেক, রশীদুল হাসান ও কয়েক জন শিক্ষার্থী।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চা-বাগানে ৯ প্রজাতির ভারতীয় টোকলাই প্রজাতির চা-গাছ ছাড়াও, বাংলাদেশ চা-গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিটি-১ থেকে বিটি-২২ পর্যন্ত ক্লোনগুলো চাষাবাদ হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে একটি বাইক্লোনাল ভ্যারাইটি ও চারটি বাংলাদেশি বাগানের ক্লোন। ল্যাটিন স্কয়ার ডিজাইনের এই গবেষণা মাঠ থেকে প্রতিদিন ২৪টি প্যারামিটারে তথ্য সংগ্রহ চলছে।

প্রফেসর ড. সাইফুল বলেন, গ্রাম থেকে শহরে আবালবৃদ্ধবণিতার প্রিয় পানীয় চা। এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। তবে চাহিদা অনুযায়ী এখনো উৎপাদন বাড়েনি। তাই বাইরের দেশ থেকে চা আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে বাণিজ্যিকভাবে দুই প্রকার চায়ের চাষ হয়। একটি চীনের চা বা ক্যামেলিয়া সাইনেসিস, আরেকটি আসামের চা বা ক্যামেলিয়া আসামিকা। সিলেট ও আসামের ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া প্রায় একই রকম। তাই সিলেটের উপত্যকায় আসামিকা চায়েরই উৎপাদন বেশি। স্ট্রং মল্ট ফ্লেভার এবং বড় দানার জন্য এর চাহিদা ব্যাপক। আসামের টোকলাই চা-গবেষণাকেন্দ্র থেকে আনা হয়েছে বিশেষ প্রজাতির ৯টি জাত। তবে গবেষক ড. সাইফুল বলেন,  মানের দিক দিয়ে তিনি বাংলাদেশ চা-গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিটি-২ চাকে এগিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, বিটি-২-এর পপুলেশন ডেনসিটি (স্থান অনুযায়ী গাছের আধিক্য) সামান্য বাড়িয়ে দিলেই মোট উৎপাদন বেড়ে যায়। তিনি প্ল্যান্ট স্পেসিং (এক গাছের থেকে আরেক গাছের দূরত্ব) কমিয়ে বিটি-২ চাষ করতে চা-বাগান মালিকদের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, পাতা বড় দেখে অনেকে আসামিকা জাত চাষ করে থাকেন। কিন্তু মানের দিকে বাংলাদেশি জাতগুলোই সেরা। উৎপাদন বাড়াতে তিনি ১০০ বছরের বুড়ো চা-গাছগুলোকে রিপ্লেস করার জন্য টি-স্টেটগুলোকে অনুরোধ করেছেন। 

চা-শিল্পের বেহাল দশা নিয়ে গবেষক ড. সাইফুল কিছুটা আক্ষেপ করেই বলেন, ‘আমি ৩০টিরও বেশি বাগান পরিদর্শন করে দেখেছি, চা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এমন লোক নেই। বাগানগুলোতে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ হচ্ছে না বিধায় আজ চা-শিল্পের এমন বেহাল দশা।’  চায়ের উৎপাদন বাড়াতে, চা-গাছের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্যই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা গ্র্যাজুয়েট লাগবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষ না থাকলে একসময় এ শিল্পটি মুখ থুবরে পড়তে পারে’। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিটি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক পদে উপযুক্ত সুযোগসুবিধা দিয়ে কৃষিবিদ নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সিকৃবির এই চা-বাগানে শুধু চা নয়, কফি গাছেরও চাষ হয়েছে। সেখানে আরো রয়েছে লেমন ঘাস, তুলসি, চুই ঝালের গাছ, কাজুবাদাম, গোল মরিচ।

ইত্তেফাক/ইআ