বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্নেহভাজন ঘনিষ্ঠ সহচর, সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য, মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার রাজনীতিবিদ আইনজীবী ও সমাজসেবক, মরহুম আবিদুর রেজা খান বর্তমান শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার অন্তর্গত ডিএমখালী গ্রামে ১৯২৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশবে বাবা মারা যাওয়ায় তার মামা তৎকালীন পূর্ব মাদারীপুরের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব মরহুম আক্কেল আলী মাস্টার সাহেবের স্নেহ ও আদরে লালিত হয়ে ডামুড্যা উচ্চাবিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবন শেষ করেন। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই মরহুম আবিদুর রেজা খান ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। কলেজজীবনেই তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সংস্পর্শে আসেন। তিনি ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি হন। কলেজজীবন শেষ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরিতে যোগদান করেন। এই সময়ে তিনি ভবিষ্যতে আইন পেশায় এবং রাজনীতিতে যোগদানের প্রস্তুতি হিসেবে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন।
সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা জেলা বারে যোগদান এবং পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। আইন পেশার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময় তিনি পূর্ব মাদারীপুর জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভীষণভাবে পশ্চাৎপদ অবহেলিত বর্তমান গোসাইরহাট ও পালং নড়িয়ার জনগণের কল্যাণার্থে বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক কর্মসূচি ও কার্যক্রম শুরু করেন তিনি।
১৯৬৯ সালে দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মরহুম আবিদুর রেজা খান যেমনিভাবে পূর্ব মাদারীপুরের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক শক্তিকে দৃঢ় ও চাঙ্গা করে তোলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করতে অন্যান্য সহকর্মী আইনজীবী বন্ধুদেরও তার আইনি অভিজ্ঞতা ও লড়াইয়ের বিভিন্ন পন্থা ও পরিকল্পনা সহযোগিতার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ও ১৯৭০-এর নির্বাচন প্রচার কাজে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবিদুর রেজা খান বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চল সফর করেছিলেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্যপদে আওয়ামী লীগের একজন মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জয় লাভের লক্ষ্যে তখনকার পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম অধ্যুষিত ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাট অঞ্চলের নিজ নির্বাচনি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থার চরম অবস্থাকে উপেক্ষা করে হেঁটে, কখনো নৌকায় রোদ-ঝড়বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের প্রার্থীদের বিপুল ভোটে পরাজিত করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের একজন সদস্য বা এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে, মরহুম আবিদুর রেজা ঢাকা শহর ত্যাগ করে নিজ এলাকায় চলে আসেন ও স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতির জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সবাইকে সংঘবদ্ধ করে একত্রিত হয়ে ভারতের ত্রিপুরার রাজ্যে গমন করেন। সরাসরি মুজিবনগর সরকারের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে নিজ এলাকা ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ছাত্র, যুবক ও জনতাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭১-এর জুলাই-আগস্ট তিনি ও তার অগ্রজ কাজী সবুর (ফরহাদ) ও তাদের দল যেদিন আগরতলায় পৌঁছায়, সেদিনই তিনি মুজিবনগর সরকারপ্রধান, শহিদ তাজউদ্দীনের নির্দেশে আগরতলা থেকে পশ্চিম বাংলায় চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে একজন বলিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ হানাদারমুক্ত হলে দেশে প্রত্যাবর্তন করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের দেশ পুনর্গঠনের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের একজন পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন। বাংলাদেশ-ইরাক মৈত্রী সমিতির সভাপতি হিসেবে ইরাক সফর করেন। তিনি বাংলাদেশ-আমেরিকা মৈত্রী সমিতির সহসভাপতিও ছিলেন।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার পরিবার ও চার জাতীয় নেতৃবৃন্দের নির্মম হত্যাকাণ্ডে বিচলিত কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ কর্মী-নেতাদের সংগঠিত করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সমুন্নত ও তাদের মনোবল অটুট রাখার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে দলীয় নেতাকর্মীদের অভয়বাণী প্রদান করেন। নিজ নির্বাচনি এলাকা ও ঢাকাস্থ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের গ্রেফতারকৃত কারাবরণকারীদের আর্থিক ও আইনি সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন।
মানবাধিকারের ও কঠোর অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাচেতনার এবং গণতান্ত্রিক নীতির পক্ষে ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে দলাদলি বা গ্রুপিং, কান কথা বলে অপরকে খেপিয়ে তোলার বিষয়গুলিকে তিনি ঘৃণা করতেন। দলীয় নেতা ও কর্মীদের তিনি মূল্যায়ন করতেন, যার যার কর্মদক্ষতা ও অবদানের গুণাবলির বৈশিষ্ট্যকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু মনে করেন নাই। মরহুম আবিদুর রেজা খান ২০০৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা শমরিতা হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিত্সারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। শরীয়তপুর জেলার নেতাকর্মী তথা আপামর জনতা শ্রদ্ধাভরে অদ্যাবধি স্মরণ করেন তাদের প্রিয় ‘আবিদ ভাইকে’, আর বৃহত্তর জেলার ‘রেজা ভাইকে’।
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক
ইমেইল : [email protected]
