বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এক নিঃসঙ্গ শেরপার কথা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৫৭

যিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হইয়া করিতেছেন অনেকের বিচার, তিনি যদি স্বয়ং বিচারহীনতার শিকার হন, তাহা হইলে তাহার চাইতে দুঃখের আর কী আছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিচারের বিষয়ে বলিয়াছেন—‘সাক্ষী হও তোমরা গো করিও বিচার!/ তোমরা হও গো সাক্ষী পৃথ্বী চরাচর!’ তাহার পর আরো বিষাদমাখা অক্ষরে লিখিয়াছেন—‘বিষাদ! বিলাসে তার মাখি হলাহল/ ধরিও সমুখে তার নরকের বিষ!/ শান্তির কুটীরে তার জ্বালায়ো অনল!/ বিষবৃক্ষবীজ তার হৃদয়ে রোপিস্!’

একটি দেশের স্থপতি, তাহার কন্যা, এমনই এক বিষাদ অনলে বাস করিতেছেন ৪৭ বৎসর ধরিয়া। পিতা, মাতা, ভাই, আত্মীয়-পরিজন হারাইয়া তিনি দেখিয়াছেন নিষ্ঠুর বিচারহীনতা। পরিবারের বিয়োগই শুধু নহে, বিচার না পাইবার বেদনাও তাহাকে তিলে তিলে দংশন করিয়া চলিয়াছে। তিনি কেন বিচার হইতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন? এই ক্ষোভ, এই দুঃখ, এই হতাশা একমাত্র তিনিই যেন বহন করিয়া সম্মুখে চলিতে পারেন। দেশে বিদেশে সর্বত্রই তিনি বিচার চাহিয়াছেন; কিন্তু তাহাকে বিমুখ হইতে হইয়াছে। এইভাবেই  তিনি যেন সকল গরল পান করিয়া নীলকণ্ঠ হইয়া ধরিত্রীর মতো সর্বংসহা হইয়া উঠিয়াছেন; কিন্তু এমনটা তো হইবার কথা ছিল না। ‘তবুও যাইতে হবে—পথে কাঁটা আছে, শুধু ফুল নহে/ তাহাও জানিও সবে! হয়তো যাইব কুসুম কাননে, হয়তো যাইব না—/ হয়তো পাইব পূর্ণ জলাশয়/ হয়তো পাইব না।/ এ দূর পথের অতি শেষ সীমা/ হয়তো দেখিতে পাব/ হয়তো পাব না—/ ভুলি যদি পথ/ কে জানে কোথায় যাব/ শুনিলে সকল, এখন তোমরা/ কে যাইবে মোর সাথ?’ কবিগুরুর এ ডাক যেন সেই এক নারীর, যিনি ৪৭ বৎসর ধরিয়া কাঁদিয়া চলিয়াছেন। শুধু নিজেরই সহিত প্রবাসে থাকা একমাত্র বোন ছাড়া পরিবারের সকলকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়া হারাইয়া আজও কাঁদিতেছেন। তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়াইয়া, জনমানুষের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বারবার প্রশ্ন রাখিয়া যাইতেছেন; মস্তবড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখিয়া চলিয়াছেন।

তিনি ভালো করিয়াই জানেন, যে হন্তারকরা ১৯৭৫ সালে ছোবল দিয়াছিল তাহাদের প্রেতাত্মা এখনো ছায়ার মতো পিছু ছাড়ে নাই। তাহারই একটি বড় উদাহরণ ছিল ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। সৃষ্টিকর্তাই সে আক্রমণ হইতে তাহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন। তাহার সেই প্রাণে বাঁচিয়া যাওয়াকে আজও ‘মিরাকল’ বলিয়া উচ্চারিত হয়। ইহা ছাড়াও চট্টগ্রামে হামলার শিকার হন, গোপালগঞ্জে বোমা পুঁতিয়া তাহাকে হত্যা পরিকল্পনা করা হয়। ইহা ছাড়াও তিনি আরো কয়েক বার ছোট-বড় পরিকল্পনা হইতে রক্ষা পান। তাহার এই বাঁচিয়া থাকা দেখিয়া সেই কথাই মনে হয়, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে?’ তিক্ততা তাহাকে ইহার সহিত অভিজ্ঞতাও দিয়াছে। সেই কারণেই তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের নিঃশ্বাসের সূক্ষ্ম শব্দও শুনিতে পান। এ কারণেই তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়াইয়া আত্মবিশ্বাসের সহিত বলিতে পারেন, ‘আমি সব শোক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি তো নীলকণ্ঠ হয়ে বেঁচে আছি। জানি অনেক কিছুই; কিন্তু আমি তো বলেছি, সব ব্যথা, সবকিছু ধারণ করেই যত শোক সব বুকে নিয়েই আমার পথ চলা।’

তিনি দেখিয়াছেন সেই অন্ধকার সময়ে বলিবার মতো দলের কেহই পাশে ছিল না। তাহার পিতা বিশ্বাস করিতেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বাঙালি জাতির উপর গভীর বিশ্বাস রাখিয়াই পথ চলিয়াছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; কিন্তু বাঙালিরাই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখিতে ব্যর্থ হইয়াছে। তাহারই কন্যা চারিদিকে এত কাঁটা, এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও পিতার মতোই মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারান নাই। কারণ তিনিও বিশ্বাস করেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস ছাড়া কোনো মহত কাজ করা সম্ভব নহে। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলায় নবকুমার যখন নৌকার সকল যাত্রীর জন্য বনে কাঠ কাটিতে গিয়া ফিরিতে দেরি করিতেছিল, এবং তাহার বিশ্বাসের মর্যাদা নষ্ট করিয়া অন্যরা যখন তাহাকে ত্যাগ করিয়া নৌকা লইয়া চলিয়া গিয়াছিল, তখন নবকুমারে মানসচিত্র প্রকাশ পাইয়াছিল একটি অপূর্ব বাক্যে—‘তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’ জাতির পিতার তনয়া তেমনি বিচারহীনতা ও ষড়যন্ত্রের শত অধমের মধ্যেও উত্তম হইয়া নিঃসঙ্গ শেরপার মতো দেশ পরিচালনা করিতেছেন। 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন