বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:১৫

করোনা মহামারিতে আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জোরালো প্রবৃদ্ধি ও বিপুল উন্নয়ন চাহিদার কল্যাণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের মতোই ‘স্থিতিশীল’ থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস’ (এসঅ্যান্ডপি)।

বাংলাদেশের ঋণমান দীর্ঘ মেয়াদে ‘বিবি’—ও স্বল্প মেয়াদে ‘বি’ বহাল রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা সংস্থাটি। বাংলাদেশের ওপর ‘এসঅ্যান্ডপি’র বার্ষিক র্যাটিং পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এটি গত ২৫ আগস্ট বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়। ঋণমানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জোরালো প্রবৃদ্ধির ধারা গড় আয় বাড়তে থাকবে এবং বছর জুড়ে বাহ্যিক ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল র্যাটিংয়ে তারই প্রতিফলন ঘটে।

এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রভাব মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রমাগত স্বাভাবিক হবে ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধে। এই বছর প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অর্জিত হতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুন মাসে সমাপ্ত অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। করোনার ধাক্কা মোকাবিলা করে আগামী এক থেকে দুই বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। ২০১০ সালে এসঅ্যান্ডপির কাছ থেকে প্রথম বারের মতো ঋণমান পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একই র্যাটিং পেয়ে আসছে। অর্থনীতির মূল্যায়নের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতি, বাজেট ঘাটতি ও বিপুল উন্নয়ন চাহিদার সম্মুখীন হলেও বিদেশি ঋণ ও জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে সুবিধা পাচ্ছে।

অর্থনীতিতে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেশের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করার বিপরীতে ভালো বাহ্যিক পরিস্থিতি, উল্লেখযোগ্য দাতাসম্পৃক্ততা থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, রেমিট্যান্স ও বিশ্বমানের তৈরি পোশাকশিল্পকে তুলে ধরেছে ‘এসঅ্যান্ডপি’।

‘এসঅ্যান্ডপি’ বলেছে, ভবিষ্যত্ রাজস্ব পরিস্থিতি জোরদারের জন্য সরকার রাজস্ব উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে র্যাটিং আরো উন্নত হতে পারে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এ ঋণমান সংস্থার মূল্যায়ন হলো, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার পথে বাধা সৃষ্টি করছে এবং সুষ্ঠু নির্ধারণের পথ বন্ধ করছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতের নীতি প্রতিক্রিয়াগুলোর পূর্বাভাসকে দুর্বল করে দিতে পারে। এসঅ্যান্ডপি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে বিরোধপূর্ণ অবস্থান শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজনকে প্রতিফলিত করে। দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অবকাঠামো ঘাটতি ও ব্যবসায় পরিবেশে জটিলতার কারণে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে আছে বলে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। ভালো ঋণমানের জন্য বর্তমানের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৩৬২ ডলারকে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে ‘এসঅ্যান্ডপি’ বলছে, এই মাত্রার আয় দুর্বল ও সংকীর্ণ রাজস্ব ভিত্তি তৈরি করে, যার ফলে বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলায় রাজস্ব ও মুদ্রা পরিস্থিতির স্থিতিস্থাপকতায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

এসঅ্যান্ডপির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের সক্রিয় অংশ নেওয়ার ফলে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার চলমান উন্নতি লক্ষণীয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক বাণিজ্যে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য রিজার্ভ উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগ্রহে দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ, ক্রমবর্ধমান আমদানি, রপ্তানি ও বিনিয়োগ বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণশিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করবে। স্বল্প খরচে ও দীর্ঘ মেয়াদে বহিঃ ঋণ অর্থনীতিতে পুনরায় অর্থায়ন ঝুঁকি হ্রাস করেছে। সহনীয় মাত্রার বৈদেশিক ঋণ, সাশ্রয়ী শর্তে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সুযোগ, বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য রিজার্ভের উপস্থিতি ইত্যাদি কারণে লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য প্রবাহ ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বাসস

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন