মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডায়াবলো ক্যানিয়ন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। এই ভাবনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আবারও প্রমাণিত হলো যে, পারমাণবিক উত্পাদন (নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট—পারমাণবিক বিদ্যুৎ উত্পাদন) কতটা জরুরি। কার্বনমুক্ত, জীবাশ্ম-জ্বালানিমুক্ত পারমাণবিক উত্পাদন বন্ধ করা হলে প্রকৃত অর্থেই তা হবে নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন করার উদ্যোগকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার শামিল। ডায়াবলো ক্যানিয়নের পরিস্থিতি বেশ জটিল। এ প্ল্যান্টের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালে। কিন্তু ২০১৮ সালে প্ল্যান্টটি বন্ধ করার জন্য একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তির পেছনে কারণ ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার ‘বেঁধে দেওয়া’ নিয়ম। প্ল্যান্টটিকে ঠান্ডা রাখার জন্য উপকূলীয় জল ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ার তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে সাত বছর আগেই লাইসেন্স রদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডায়াবলো ক্যানিয়ন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট তথা পারমাণবিক উত্পাদন কার্বনমুক্ত শক্তির একটি মূল্যবান উত্স। ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন কার্বনমুক্ত পারমাণবিক উত্পাদনের প্রশ্নে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কাজেই এটিকে ধরে রাখাই যুক্তিযুক্ত হবে। বিশেষ করে নতুন নবায়নযোগ্য উত্স কিংবা অন্য কোনো স্বল্প কার্বন নিঃসরণকারী গ্রিন হাউস গ্যাসের (জিএইচজি) সন্ধান পাওয়ার আগ পর্যন্ত।
ডায়াবলো ক্যানিয়নের কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিপরীত চিন্তা করার তাত্ক্ষণিক অভিঘাত হবে পাওয়ার সিস্টেমের (জ্বালানি ব্যবস্থা) নির্ভরযোগ্যতার ওপর বড় ধরনের আঘাতের সমতুল্য। ক্যালিফোর্নিয়া ২০৪৫ সালের মধ্যে কার্বনমুক্ত জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে বদ্ধপরিকর। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য জীবাশ্ম উত্পাদন ইউনিটগুলো বন্ধ করে দেয় ক্যালিফোর্নিয়া। কিন্তু এর ফলে দেখা যায়, সাপ্লাই চেইন ও অন্যান্য নানামুখী সমস্যার কবলে পড়ে নবায়নযোগ্য উত্পাদন ও বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রকল্পের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা পরিস্থিতি সৃষ্টির ফলে জলবিদ্যুৎ উত্পাদন নির্ভরযোগ্যতা হারায়। আমরা দেখেছি, ২০২০ সালের আগস্টে বিদ্যুৎ ঘাটতির শিকার হয় ক্যালিফোর্নিয়া। তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে সমগ্র পশ্চিমে অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায় বিদ্যুতের চাহিদা। সৃষ্টি হয় বিদ্যুতের তীব্র আকাল অবস্থা।
পারমাণবিক উত্পাদনের বিরোধিতাকারীদের যুক্তি হলো, নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নে কিংবা কার্বন নির্গমনকে মোকাবিলা করার জন্য ডায়াবলো ক্যানিয়নের প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য উত্পাদন বাড়াতে পারলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। উপরন্তু জ্বালানি দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কার্যকর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে। তাদের বক্তব্য হলো, জিএইচজি নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান পারমাণবিক উত্পাদনে না গিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে বেশি করে ঝুঁকতে হবে। বিরোধীপক্ষের যুুক্তি হলো, কার্বনমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন ক্লিন জেনারেশন প্রজেক্টে যেভাবে মূলধন বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার কোনো মানেই হয় না; বরং অন্যান্য যেসব প্রজেক্ট গ্রহণ করার মাধ্যমে জীবাশ্ম ব্যবস্থাকে হঠানো যাবে, সেসব প্রজেক্টে মূলধন বিনিয়োগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অর্থাত্ জীবাশ্ম উত্পাদনের রশি টানতে মূলধন খাটানো উচিত সর্বাগ্রে। অধিকন্তু, পারমাণবিক উত্পাদন ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ক্লিন পাওয়ার (লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ভেনচুরা কাউন্টি জুড়ে সরবরাহকৃত ‘ক্লিন পাওয়ার অ্যালায়েন্স’ হলো ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয়ভাবে পরিচালিত ক্লিন ইলেকট্রিসিটি প্রজেক্ট) সরবরাহ করে, যাকে আবহাওয়া বা ঋতুগত ব্যাঘাত সৃষ্টির জন্য দায়ী করা যায়। কাজেই পারমাণবিক উত্পাদন ত্বরান্বিত করার বিষয়কে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো হবে। এটি বিলম্বিত বা স্থগিত করতে হবে।
তবে বিরোধীপক্ষের এসব যুক্তি ধোপে টিকছে না স্ট্যানফোর্ড এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ডায়াবলো ক্যানিয়নের কার্যক্রমের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের মূল্যায়ন করে একটি গবেষণা চালায় প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণা-সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত প্ল্যান্টের কাজ চালিয়ে যাওয়া হলে তা বরং কার্বন নিঃসরণ কমাবে। ক্যালিফোর্নিয়ার পাওয়ার সেক্টরগুলো থেকে নির্গত কার্বন ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে তা জ্বালানি উত্পাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দেবে ২০ শতাংশের বেশি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, এর ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার হ্রাস পাবে ব্যাপকভাবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলে তা হবে বড় স্বস্তির বিষয়। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের আকাল ‘হাহাকার অবস্থা’ সৃষ্টি করেছে। গবেষণার শেষাংশে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত প্ল্যান্টটিকে ঠিকঠাকভাবে চালু রাখতে পারলে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। প্রকৃতপক্ষে সাশ্রয় হবে আরো বেশি। যেহেতু গ্যাসের দাম এখন আরো অনেক বেশি।
খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে পারমাণবিক উত্পাদন বন্ধ করার কারণে নেতিবাচক ফলাফলের বেশ কিছু নজির রয়েছে। নিউইয়র্কের ইন্ডিয়ান পয়েন্ট ইউনিটগুলো (নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট) ২০২০ ও ২০২১ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে গ্যাসচালিত উত্পাদন বেড়ে যায়। বৃদ্ধি পায় জিএইচজি নির্গমন। ২০১১ সালে নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইউনিটগুলো বন্ধ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে জার্মানি। তড়িঘড়ি করে বেশির ভাগ পারমাণবিক উত্পাদন বন্ধ করে দেয় দেশটি (প্রায় অর্ধেক ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়)। এর বিপরীতে নবায়নযোগ্য উত্পাদনে জোর দেওয়া হয়। করা হয় ব্যাপক বিনিয়োগ। এর ফলস্বরূপ বিপুল পরিমাণে লিগনাইট, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয়েছে জার্মানিকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করা সত্ত্বেও পরবর্তী দশকের বেশির ভাগ সময় জুড়ে জিএইচজি নির্গমন তুলনামূলকভাবে বেশিই ছিল। ২০২১ সালের শেষের দিকে বিদ্যুতের রেকর্ড-উচ্চ দাম এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও অবশিষ্ট অর্ধেক প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেয় জার্মানি। আর বাকি আছে মাত্র তিনটি প্ল্যান্ট। ২০২২ সালের শেষে বন্ধ করার কথা রয়েছে এগুলোও। তবে চলমান জ্বালানিসংকটের কারণে এগুলো বন্ধ না করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। যদিও কোনো চুক্তি হয়নি এখন পর্যন্ত।
রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর জ্বালানির দাম অতি দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ফলে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর অধিকতর গুরুত্বের নিরিখে বেশ কয়েকটি দেশ পারমাণবিক উত্পাদনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। বেলজিয়াম দুটি প্ল্যান্টের উত্পাদন আরো ১০ বছরের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১১ সালের সুনামির কারণে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়া ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে কাজ চলাচ্ছে জাপান। আসন্ন শীতে পরিস্থিতি করুণ হয়ে ওঠার আগেই প্ল্যান্টগুলো পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়াতে এবং নতুন ও উন্নত নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ ও বিস্তারের চেষ্টা করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট থেকে বেরিয়ে আসার পূর্বের নীতিকে উলটে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রশাসন। এখন পারমাণবিক উত্পাদন বাড়াতে মনোযোগী হচ্ছে দেশটি। জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন আনছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিদ্যমান পারমাণবিক উত্পাদনের মূল্যকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে বাইডেন প্রশাসন।
ডায়াবলো ক্যানিয়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হাতে খুব একটা সময় নেই। কার্যক্রম শুরু করতে দেরি করলে পরিস্থিতি দিনকে দিন জটিল হয়ে উঠবে—প্রযুক্তিগতভাবে কিংবা উত্পাদনের সব ক্ষেত্রেই। উপকূলীয় জল ব্যবহার ইস্যুতে প্ল্যান্টটি বন্ধ করার বিষয়ে গভর্নরের প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তা প্ল্যান্টের চালু হওয়ার (নতুন করে) সময়কে অনেকটা বাড়িয়ে দেবে। সময়সীমা পিছিয়ে যেতে পারে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। নতুন করে পরবর্তীকালে শুরু করতে গেলে গুনতে হবে অতিরিক্ত অর্থ। তাছাড়া প্ল্যান্টটি বন্ধ হয়ে গেলে তার জায়গা নেবে অন্য কোনো উত্পাদন ব্যবস্থা—যা জিএইচজি নির্গমনসহ অন্যান্য নানামুখী ক্ষয়ক্ষতি সামনে আনবে বহুগুণে। এর ফলে স্বভাবতই জ্বালানির প্রশ্নে উন্নত নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্র নিয়ে ভাবতে হবে নতুন করে। যার ফলে শুধু সময়েরই অপচয় হবে। কেননা যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যাবে আগেই। কাজেই প্ল্যান্টটি চালু করার বিষয়ে ত্বরিত ভাবতে হবে। এর বিভিন্ন দিক নিয়ে সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করার প্রেক্ষাপটে এবং জ্বালানি সুরক্ষা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বিশ্ব যদি একটি জায়গায়-ই দাঁড়িয়ে থাকে তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। এর মাশুলও হবে বেশ চড়া। কাজেই কার্বনমুক্ত পারমাণবিক উত্পাদন বন্ধ করার কোনো মানেই হয় না। এমনকি যদি নবায়নযোগ্য উত্পাদনে ভালো ফল পাওয়া যায়, তার পরও না। বরং এর বিপরীতে নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে, এ কার্বনমুক্ত উত্পাদনকে সচল করা, সক্রিয় রাখা। প্ল্যান্টের সংখ্যা আরো বাড়ানো এবং একই সঙ্গে উচিত জিএইচজি নিঃসরণকারী জীবাশ্ম উত্পাদন বন্ধ করা। ভুলে গেলে চলবে না, বর্তমান সংকটময় মুহূর্ত আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। টেকসই জ্বালানি উত্পাদন ও জ্বালানি সক্ষমতা আজকের বিশ্বে এমনকি আগামী দিনগুলোর জন্য যে কতটা জরুরি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এমতাবস্থায়, জ্বালানির প্রশ্নে ‘কার্যকর-নির্ভরযোগ্য উত্পাদন ব্যবস্থা’ প্রণয়ন শুধু প্রয়োজনীয় বিষয়ই নয়; একই সঙ্গে সময়ের দাবি।
লেখক: আটলান্টিক কাউন্সিল গ্লোবাল এনার্জি সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ও সেন্ট্রাস এনার্জির সাবেক প্রধান কর্মকর্তা
আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন
