কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীতে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে মাছ ধরা। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মাদক ও সীমান্তে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এখনো বিদ্যমান থাকায় মাছ শিকার করতে পারছেন না জেলেরা। এমনকি সীমান্তে বেড়ি বাঁধে বন্ধ রয়েছে মানুষের চলাচলও। ফলে, নাফ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের পরিবারে হাহাকার চলছে।
নাফ সীমান্ত খামারি গ্রুপের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নিজ দেশ মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকে মাদক ও চোরাচালান বন্ধে নাফ নদীতে মাছ শিকারসহ নামতেও নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। এতে বংশ পরম্পরায় নাফ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা টেকনাফের শত শত জেলে পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে। মাছ শিকার ছাড়া ভিন্ন কোনো পেশার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ডে লেবারি করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় জেলে সিরাজুল ইসলামের মতে, নাফ নদীর কিনারায় বসতি হওয়ায় বাপ-দাদার আমল হতেই আমাদের পরিবার মাছ শিকার করেই সংসার চালিয়ে এসেছে। নাফ নদীতে সব সময় পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায়। তাই মাছ শিকার ছাড়া অন্য কোনো পেশায় তারা অভ্যস্ত হয়নি। এখনো নতুন পেশায় অভ্যস্ত হতে না পেরে বিগত ছয়টি বছর আমাদের মতো শত শত জেলে পরিবার মানবেতর জীবন পার করছে। তার দাবি, নাফ নদীর তীর ঘেঁষে থাকা অর্ধসহস্রাধিক পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার নাফ নদীতে মাছ শিকারের সুযোগ দিক।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, নাফ নদীর বাংলাদেশ সীমান্তে সকাল-সন্ধ্যা মাছ শিকার করত হাজারো জেলে। মাছ বিক্রির আয় দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবারের ভরণপোষণ চলত। কিন্তু বিগত ছয়টি বছর এসব জেলেদের কর্মক্ষেত্র বন্ধ। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে চোরাচালান ও মাদক পাচার বন্ধে নাফ নদীর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, যারা জেলে সেজে মাদক ও চোরাচালানে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে সাধারণ জেলেদের মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আন্দোলনের নেতা ও নাফ নদী ঘেঁষা উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গারাই এখন স্থানীয় পেশাজীবীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। তাদের কারণেই নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রয়েছে। হাজারো জেলেকে মাছ শিকারে সুযোগদানের লক্ষ্যে ইতিপূর্বে সরকারের কাছে স্মারকলিপিসহ মৎস্যজীবী নানা সংগঠন মানববন্ধন করেছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। জেলে পরিবারের হাহাকার দূর করতে মানবিক দিক বিবেচনায় প্রকৃত জেলেদের নাফ নদীতে মাছ শিকারের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
টেকনাফ উপজেলা মৎস্য র্কমর্কতা মো. দেলোয়ার হোসাইন জানান, মাদক ও চোরাচালান রোধ এবং আইনশৃঙ্খলাজনিত কারণে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রয়েছে। তবে প্রকৃত জেলেদের দিনের বেলায় মাছ শিকারের সুযোগ দেওয়া দরকার। টেকনাফ উপজেলা (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরফানুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক সমস্যার কারণে সরকারিভাবে নাফ নদীতে মাছ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এখনো পর্যন্ত সে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
