জ্বালানি তেলের আধুনিক শোধনাগার দরকার

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:০৫

১৯৬০ সালে তৎকালীন শাসনামলে একজন জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ এ দেশে একটি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এটিই আজকের বাংলাদেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার। ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী সেটিকে কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। কেটে গেল প্রায় ৬২ বছর। বিগত কোনো সরকারই মনে করেনি যে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রেখে আরও জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর এবং এই তেলের অনেকটা অপরিশোধিত। এবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা দিল কৃত্রিম জ্বালানি সংকট। সেই সংকটের মুখোমুখি এখনো বাংলাদেশ। এমতাবস্থায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, রাশিয়া বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে রাশিয়ার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং আছে।

সরকার রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। গত মে মাসে প্রথম রাশিয়া বাংলাদেশে জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রস্তাব দেয়। তবে দুই সপ্তাহ আগে ফের প্রস্তাব দিলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে তাদের প্রস্তাব খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটিও গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রথম বার মে মাসে প্রস্তাবের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার তেল শোধনের উপযোগী রিফাইনারি বাংলাদেশে নাই। আর এ ধরনের প্ল্যান্ট করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর লেগে যাবে।’ কিন্তু রাশিয়া এখন পরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছে এবং তা অনেক কম দামে। বিপিসির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এ সময় অপরিশোধিত তেল এসেছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টন। বাংলাদেশ মূলত অপরিশোধিত তেল কেনে সৌদি আরবের সৌদি আরামকো এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে। আর পরিশোধিত তেল সরবরাহ করে কুয়েত, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতের আটটি কোম্পানি থেকে। এর মধ্যে চীনের কোম্পানি দুটি। এখন সমস্যা হলো রিফাইনারি।

বিপিসি বলছে, বাংলাদেশের শোধনাগারে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা সম্ভব নয়। কারণ এর ঘনত্ব মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের তুলনায় বেশি। পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন সংবাদমাধ্যমেকে বলেছেন, ‘শোধনের বিষয়টি দেখতে রুশ বিশেষজ্ঞরা শিগিগরই বাংলাদেশে আসছেন। তারা স্থানীয় শোধনাগারগুলি পরিদর্শন করে এখানে রাশিয়ান তেল পরিশোধনের উপায় বের করবেন। এরপর আমরা সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেব। তবে এটাকে প্রধান বাধা মনে করা হচ্ছে না। কারণ বিকল্প ব্যবস্থা আছে। রিফাইন করা জ্বালানি তেল আনা যায়। আবার তৃতীয় কোনো দেশেও রিফাইন করা যায়। কিন্তু বড় বাধা হলো ইউক্রেন আক্রমণের কারণে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর বাংলাদেশ কীভাবে তেলের অর্থ পরিশোধ করবে তার উপায় বের করা।’

জানা যায়, ‘হিউজটন’ নামে একটি কোম্পানি রাশিয়ার পরিশোধিত ডিজেল বিক্রির প্রস্তাব জমা দিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তারা প্রতি ব্যারেল ৫৭ টাকা দর দিয়েছে। প্রতি লিটারের দাম পড়বে ৪০ টাকার কম। তেল জাহাজে পাঠানো হবে দুবাই থেকে। এছাড়া প্রতি টন রাশিয়ান ডিজেল ৪২৫ ইউএস ডলারে দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। তাতে প্রতি ব্যারেলের (১৫৯ লিটার) দাম পড়ে ৫৭ দশমিক ৪৩ ডলার । ডলার ১১০ টাকা হিসেবে ধরলে প্রতি লিটারের আমদানি খরচ পড়বে ৪০ টাকার কম। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত ডিজেল ৫৯ ডলারে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রসনেফট অয়েল। প্রতিষ্ঠানটি এই দরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। বিশ্ববাজারে এর দাম কমলেও বাংলাদেশে এখনো উচ্চমূল্যেই বিক্রি হচ্ছে। চলতি মাসেই নজিরবিহীনভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হুহু করে বাড়ছে। বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোলের দাম ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা লিটার। অকটেনের দাম ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা লিটার। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারলে বাংলাদেশ এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিক্রিয়া কী হবে। আর এক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা আছে। যেমন—পেমেন্ট কীভাবে করা হবে? রাশিয়া কতখানি ছাড় বা ডিসকাউন্ট দেবে? প্রোডাক্ট, না কি ক্রুড অয়েল আনা হবে? ক্রুড আনলে সেটা প্রসেস করতে রিফাইনারির অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। তাতে কত দিন সময় লাগবে। এতে খরচ কত পড়বে? ক্রুড থেকে কতখানি সেভিংস হবে—এরকম আরও অনেক বিষয় আছে। এখন কমিটি সেগুলো দেখছে।

রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য অনেক সুবিধা হতো। কিন্তু বড় সমস্যা একটাই—রিফাইনারি। বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার করার চিন্তাভাবনা নেই। ইস্টার্ন রিফাইনারি ৬২ বছরের পুরোনো। সেটি কখন কি অবস্থা হয়, সেটিও ভাবনার বিষয়। কাজেই বিষয়টি নিয়ে সরকারের উদ্যোগী হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার

 

 

ইত্তেফাক/ইআ