বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গবেষণার প্রয়োজন কতটা?

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:৩১

মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসই পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ১৯৫০ সালের দিকে প্রথম বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির রেকর্ড শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুসারে দেখা যায়, ২০২১ সালে বৈশ্বিক উষ্ণতার গড় বৃদ্ধি ছিল ১.১ থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২১ সালে চীন, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, নাইজেরিয়া, সৌদি আরব ও ইরানে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২১ সালকে সপ্তম উষ্ণতম বছর হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি ২০২২ সালও উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে। ক্রমান্বয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গ্রিনহাউজ গ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। কার্বন ডাইঅক্সাইড ৭৬ শতাংশ, মিথেন ১৬ শতাংশ, নাইট্রাস অক্সাইড ৬ শতাংশ ও ২ শতাংশ ফ্লোরিনেটেড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান রয়েছে। বছরে মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের ১৬.৮ শতাংশ শিল্পায়নে, ১৪ শতাংশ যানবাহনে ব্যবহূত জ্বালানি, ১২.৫ শতাংশ কৃষিজাত বাইপ্রডাক্ট, ১১.৩ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ২১.৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন, ৩.৪ শতাংশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ১০ শতাংশ ভূমি ব্যবহার ও বায়োমাস বার্নিং এবং ১০.৩ শতাংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক উত্স থেকে বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে।

শতাংশের হিসাবে কার্বন ডাইঅক্সাইডই সবচেয়ে বেশি বায়ুমণ্ডলে দৃশ্যমান রয়েছে। এই কার্বন ডাইঅক্সাইড, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বনায়ন ধ্বংস, শিল্পায়ন, কৃষির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটির অব্যবস্থাপনায় বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি উৎপাদন ও বায়োমাস বার্নিংয়ে বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কৃষিতে কৃত্রিম রাসায়নিক সার প্রয়োগে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার ফ্লোরিনেটেড গ্যাসসমূহ : হাইড্রোফ্লোরো কার্বন, পারফ্লোরো কার্বন ও সালফার হেক্সাফ্লোরাইড শিল্পায়ন ও রেফ্রিজারেটর থেকে প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের ৭৮ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি ও শিল্পায়নে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে কৃষি, বনায়ন ধ্বংস ও অপরিকল্পিতভাবে ভূমি অধিগ্রহণ দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি মাইল গাড়ির ড্রাইভে প্রায় এক পাউন্ড কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৯ শতাংশ, ভারত ৭ শতাংশ, রাশিয়া ফেডারেশন ৫ শতাংশ ও জাপান ৪ শতাংশ হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গমন করে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশ থেকে বাকি ৩০ শতাংশ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমিত হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অ্যান্টার্কটিকায় বিদ্যমান বরফের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে ইন্দোনেশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, মিয়ামি ও ম্যানহাটান এবং বাংলাদেশের ন্যায় নিম্নাঞ্চল বৈশিষ্ট্যের দেশসমূহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বছরে তিন মিলিমিটার হারে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা ও লবণাক্ততার প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ১ কোটির বেশি মানুষ হুমকির সম্মুখীন রয়েছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাড়ায় আগামী ২০৫০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি জনসংখ্যার হিসাব ঠিক থাকে, তাহলে বছরে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে বাংলাদেশে বর্ধিত জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা মেটানো, অন্যদিকে সমুদ্রের পানির উচ্চতার ক্ষতিকর প্রভাব।

গবেষণায় আরো দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ ক্ষতির শিকার হতে পারে। বাংলাদেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বহু এলাকায় আমন ধানের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। আমন ধানের চাষাবাদ বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে বিদ্যমান আমন ধানের জাতসমূহ জুলাই থেকে আগস্ট মাসে জমিতে রোপণ করা হয়। বর্তমানে বহু এলাকায় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা আমন ধানের চাষাবাদের সঠিক সময় থেকে কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে খাদ্য উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত হানার বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগের সম্মুখীন হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত প্যাথোজেনের বায়োটাইপ পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে মানুষ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুজ্বর ও এনসেফালাইটিসজনিত বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া মানুষ হেপাটাইটিস, নিউমোনিয়া, জিকা ও অ্যানথ্রাক্সেরও সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিহীনতা, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও হিট স্ট্রোকে বছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে বছরে প্রায় ২ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে আরো দেখা যায়, মানুষের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত ৫৮ শতাংশ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে সমগ্র বিশ্বে ১২০ কোটির কাছাকাছি জলবায়ু-শরণার্থী বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশসমূহ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বছরে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করছে। এই খরচ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৪০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২৮০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমাদের কিছু পদক্ষেপ বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়িতে প্রয়োজন ব্যতীত বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে পায়ে হাঁটা, বাইক ও পাবলিক যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো দরকার।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক উষ্ণতা সহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদনের ওপর গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। এই গবেষণার পরিধি ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতায় খাদ্য নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : বিভাগী প্রধান, এনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ইত্তেফাক/ইআ